রিপন হোসেন সাজু,বিশেষ প্রতিনিধি।। যশোরের প্রথিতযশা সাংবাদিক দৈনিক কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি কবি ফখরে আলম (৬০) আর নেই (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে তিনি নিজ বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আট বছর ধরে তিনি ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
মৃত্যুকালে তিনি মা রওশন আরা বেগম, স্ত্রী নাসিমা আলম, কন্যা নাজিফা আলম মাটি ও পুত্র ফাহমিদ হুদা বিজয়সহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধব ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বৃহস্পতিবার বাদ আসর যশোর জিলা স্কুল মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর গ্রামের বাড়ি চাঁচড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ২য় নামাজে জানাজা শেষে
পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ।
ফখরে আলম ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে আমি ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এরপর থেকে তিনি ভারতের টাটা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছিলেন। ২০১৮ সালের ০২ এপ্রিল ক্যান্সারের কারণে তিনি দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন। ফখরে আলমের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত: কবি ফখরে আলম ১৯৬১ সালের ২১ জুন যশোরে জন্মগ্রহণ করেন।
মা রওশন আরা বেগম গৃহিনী। বাবা শামসুল হুদা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। ১৯৭৭ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৭৯ সালে সরকারি এমএম
কলেজ থেকে এইচএসসি, ১৯৮১ সালে ঐ কলেজ থেকে তিনি বিকম পাশ করেন। ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
সাংবাদিকতা : ছাত্র জীবনেই তিনি সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৮৫-৮৬ সালে ইত্তেফাক গ্রুপের সাপ্তাহিক ‘রোববার’ পত্রিকায় প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯১ সালে দৈনিক আজকের কাগজের যশোর জেলা
প্রতিনিধি পদে যোগ দিয়ে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নেন।
এরপর দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, দৈনিক মানবজমিন, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক আমাদের সময়, দৈনিক যায়যায় দিন ও দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ১৯৯২ সাল থেকে স্টাফ রিপোর্টার, সিনিয়র রিপোর্টার, বিশেষ প্রতিনিধি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন। ফখরে আলম দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের সমস্যা-সম্ভবনা নিয়ে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে কাজ করছেন।
তিনি এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলির অনুসন্ধান করে সংবাদ পরিবেশন করেছেন। গড়ে প্রতিমাসে তার ৩০টির বেশি নিজস্ব প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাংবাদিকতা :সাংবাদিকতার প্রথম থেকেই ফখরে আলম মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লেখা শুরু করেন। দীর্ঘ সময়কালে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কয়েকশ’ প্রতিবেদন লিখেছেন। ২০০০ সালে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় তিনি এদেশে সবচেয়ে সাড়া জাগানো সিরিজ রিপোর্ট ‘সেই রাজাকার’ লেখা শুরু করেন।
তিনি অনুসন্ধান চালিয়ে যশোরে কয়েকটি বধ্যভূমি খুঁজে বের করেছেন। ২০০১ সালে যশোর সদর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের একাত্তরে মুখে গুলিবিদ্ধ ৩০ বছর হা করতে না পারা রাহেলাকে নিয়ে একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন লেখেন। রিপোর্টটি প্রকাশের পর সেনাপ্রধানের নির্দেশে যশোর সিএমএইচ হাসপাতালে অপারেশন করে রাহেলার মুখ থেকে গুলি বের করা হয়। তিনি কুষ্টিয়ার কোহিনুর ভিলার বংশের সব সদস্য শহীদ হওয়ার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রথম লেখেন।
এছাড়া মুজিবনগর ইনফরমার, শিশু মুক্তিযোদ্ধা, কৃষক মুক্তিযোদ্ধা, দুর্ধর্ষ রাজাকার মেহের জল্লাদ, ওসি ইব্রাহিম,খালেক রাজাকারসহ আরো কয়েক জন রাজাকারকে নিয়ে লিখেছেন। যশোরের বীরঙ্গণা হালিমা, ফাতেমা, রোকেয়াকে নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন লিখেছেন। তাদেরকে ছয় লাখ টাকা আর্থিক অনুদান পেতে সহায়তা করেছেন। তিনি শংকরপুর বধ্যভূমি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লেখার পাশাপাশি সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তাঁর দু’টি গ্রন্থ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু-গবেষণা ও সাংবাদিকতা : ফখরে আলম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি পত্র-পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর জানা-অজানা বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছেন। বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়া নিয়ে তার একটি গ্রন্থ রয়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধুর বন্ধু টুঙ্গিপাড়ার সেইসব সাহসী মানুষ যারা বঙ্গবন্ধুকে ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে, রিলিফের শাড়ি কাফনের কাপড় হিসেবে ব্যবহার করে ইসলামী বিধি-বিধান মত সমাহিত করেছিলেন; তাদের নিয়ে লিখেছেন।
বঙ্গবন্ধুর প্রিয় সাইকেল, কোলকাতার বেকার হোস্টেল, ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ফেরা, ৭ মার্চের ভাষণের কাব্যকথাসহ বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন দিক নিয়ে লেখালিখি করেছেন। এ বিষয়ক ‘জানা-অজানা বঙ্গবন্ধু’ বলে তার একটি ব্যতিক্রমধর্মী গবেষণা গ্রন্থ রয়েছে। কৃষি বিষয়ক সাংবাদিকতা :
কৃষি বিষয়ক সাংবাদিকতায় ফখরে আলম বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ধান, ফুল, ফল, মাছ চাষ নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মহেশ্বরচান্দা
গ্রাম ও কৃষি বিপ্লবের নায়ক ওমর আলীকে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখে দেশ জুড়ে সাড়া জাগিয়েছেন। তিনি গাইদঘাট কৃষি ক্লাব, বিষমুক্ত সবজি, কৃষক সংগঠক আইয়ুব হোসেনকে নিয়ে কাজ করেছেন। এই অঞ্চলের কৃষির সম্ভবনা তার খবরের অন্যতম উপাদান।
কৃষি বিষয়ক সাংবাদিকতায় তিনি ১৯৯৮ সালে বার্ক এর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। একই বছর তিনি কৃষি
বিষয়ক সাংবাদিকতায়। বিসিডিজেসি ও নোভার্টিজ এর ফেলোশিপ অর্জন করেন। শিল্প সাহিত্য :
ফখরে আলম একজন কবি। স্কুল জীবন থেকেই তিনি কবিতা লিখছেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ
প্রায় সব পত্র-পত্রিকায় তার কবিতা ছাপা হয়েছে। বাংলা একাডেমীর উত্তরাধিকার ও পশ্চিমবঙ্গের শিব নারায়ন রায় সম্পাদিত জিজ্ঞাসা পত্রিকায় তার কবিতা স্থান পেয়েছে।
১৯৮০-৮১ সালে ফখরে আলম যশোর সরকারি এমএম কলেজের ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পালন কালে তিনি কলেজ বার্ষিকী সম্পাদনা করেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তার কবিতা দেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি ১৯৯১ সালে যশোর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকার সময় দেশ।
সম্পাদকীয়,বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৮/১, আরামবাগ,মতিঝিল-ঢাকা-১০০০
যোগাযোগ: মোবাইল ০১৭১৩-৩৩২১৫৯- ০১৩১৮-৬৮০৩৮১
আমাদেরবাংলাদেশ. ডট কম