রিপন হোসেন সাজু,মনিরামপুর(যশোর)অফিস ॥ কর্মক্ষম স্বামী এবং ছেলেকে হারিয়ে শোকাহত মা মেহেরুন্নেছা সংসারের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখন পাথর হয়ে গেছেন। নিজে এখন পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নিয়েছেন নাবালক ছেলে এবং বৃদ্ধ শাশুড়ির মুখের খাবার যোগাতে। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ছোবলে মনিরামপুর উপজেলার কপোতাক্ষ পাড়ের পারখাজুরা গ্রামের দফাদার পাড়ায় গাছচাপায় নিহত হন মেহেরুন্নেছার স্বামী নজরুল ইসলাম ওয়াজেদ(৬৫) এবং ছেলে মো. ইসা(১৫)।
এ ছাড়াও গাছচাপায় নিহত হন একই গ্রামের মৃত জবেদ আলীর অশীতিপর স্ত্রী আছিয়া বেগম(৭৫), ঋষিপাড়ার খোকন দাস(৬৫) ও তার স্ত্রী বিজন দাসী(৫৫)। গাছ পড়ে তাদের বসতঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। অর্থাভাবে পরিবারবর্গ এখনও ঘর মেরামত করতে পারেনি। ফলে পরিবারবর্গ এখন ঠাঁই নিয়েছে আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে। শুক্রবার বিকেলে সরেজমিন গিয়ে ভুক্তভোগীদের সাথে আলাপ করে জানা যায় এসব আর্তনাদের কথা।
এ পর্যন্ত নিহত পাঁচ পরিবারকে সরকারিভাবে দেওয়া হয়নি কোনো অর্থ অথবা কোনো ত্রাণ সামগ্রী। কথা হয় নিহত নজরুল ইসলাম ওয়াজেদের স্ত্রী মেহেরুন্নেছার সাথে। তিনি জানান, চার ছেলের মধ্যে বড় ছেলে আবু মুছা এবং মেঝ ছেলে হারুন অর রশিদ রাজমিস্ত্রীর কাজ করে। তারা দুই ভাই বিয়ের পর আলাদা হয়ে গেছে। স্বামীর দেড় শতক পৈত্রিক ভিটায় টালির ছাউনি দিয়ে একটি ঘর করে সেখানে স্বামী-স্ত্রী দুই ছেলে এবং বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে চলছিল তাদের সংসার।
সংসারের দৈন্যদশার কারণে স্বামী এবং সেজ ছেলে মো. ইসা গ্রামের মশিয়ার রহমানের পোল্ট্রি খামারে নৈশ্য প্রহরীর কাজ করত। আর এ জন্য প্রতিদিন বাপ-বেটা পারিশ্রমিক পেত ২৫০ টাকা। তিনি জানান, ২০ মে রাতে ঘুর্ণিঝড়ের সময় তারা বাপ-বেটা পোল্ট্রি খামারের মধ্যে ঘুমিয়ে ছিল। এ সময় বড় একটি কাঁঠাল গাছ উপড়ে খামারের ওপর আছড়ে পড়লে চালের চাপায় ঘটনাস্থলেই বাপ-বেটার মৃত্যু হয়।
মেহেরুন্নেছা জানান, কর্মক্ষম স্বামী এবং ছেলের অকাল মৃত্যুর পর তার সংসারে থাকা স্কুল পড়–য়া ছেলে এবং বৃদ্ধ শাশুড়ির মুখে খাবার তুলে দিতে কোনো কুলকিনারা না পেয়ে অবশেষে তিনি অপরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নিয়েছেন। অন্যদিকে একই পাড়ার মৃত জবেদ আলীর স্ত্রী আছিয়া বেগম ঝড়ের রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন টালির ছাউনি একটি খুপড়ি ঘরে।
আছিয়া বেগমের স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ে(মায়ের সাথে বসবাস করে) লুৎফুন্নেছা জানান, ঝড়ে ঘরের চাল এবং দেওয়াল পড়ে তার মা গুরুতর আহত হন। এর ঘন্টাখানেক পর মায়ের মৃত্যু হয়। আছিয়া বেগমের একমাত্র ছেলে রাজমিস্ত্রী সেলিম হোসেন বিয়ের পর আলাদা হয়ে যায়। স্বামী পরিত্যক্তা মেয়েকে নিয়েই ছিল আছিয়া বেগমের সংসার। অন্যদিকে ঋষিপাড়ার খোকন দাস ও তার স্ত্রী বিজন দাসী ঝড়ের সময় টালির ছাউনি কাঁচা ঘরের মধ্যে ঘুমিয়ে ছিলেন।
খোকন দাসের কাকাতো ভাই রাজকুমার দাস এবং অরবিন্দু দাস জানান, ঝড়ের সময় একটি বড় রেন্টি গাছ উপড়ে পড়লে চাল এবং দেওয়াল চাপায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় স্বামী-স্ত্রীর। খোকন দাসের কোনো ছেলে সন্তান নেই। খবর পেয়ে পরদিন সকালে শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঁচ মেয়ে-জামাই আসে বাবা-মায়ের সৎকার করতে। বড় মেয়ে দিপালী রানী, মেঝ মেয়ে শিফালী রানী জানান, হতদরিদ্র বাবা-মায়ের একমাত্র কাঁচা খুপড়ি ঘরটি ঝড়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়াই তারা এখন আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছেন।
তবে নিহত ওয়াজেদের স্ত্রী মেহেরুন্নেছা, আছিয়া বেগমের মেয়ে লুৎফুন্নেছা এবং খোকন দাসের মেয়ে দিপালী রানী জানান, এ পর্যন্ত সরকারিভাবে তাদেরকে কোনো অর্থ এমনকি কোনো ত্রাণ সামগ্রী দেওয়া হয়নি। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ইফতেখার সেলিম অগ্নি ঈদের আগে প্রতি পরিবারকে নগদ অর্থ এবং এক মাসের চাল, ডালসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী প্রদান করেন।
এছাড়া স্থানীয় মশ্বিমনগর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেন চাল এবং সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এমএ গফুর প্রতি পরিবারকে নগদ অর্থ প্রদান করেন। এ ব্যাপারে কথা হয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেনের সাথে । তিনি জানান, ইতোমধ্যে নিহতদের তালিকা পাঠানো হয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহসান উল্লাহ শরিফী জানান, নিহতদের প্রতি পরিবারের জন্য সরকার ইতোমধ্যে ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। আজ-কাল তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
সম্পাদকীয়,বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৮/১, আরামবাগ,মতিঝিল-ঢাকা-১০০০
যোগাযোগ: মোবাইল ০১৭১৩-৩৩২১৫৯- ০১৩১৮-৬৮০৩৮১
আমাদেরবাংলাদেশ. ডট কম