
আমাদেরবাংলাদেশ ডেস্ক: চলমান অভিযান অব্যাহত থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, অপরাধী কাউকে বাঁচানোর কোনো তদবির নিয়ে কোনো নেতা আমার কাছে আসবেন না। আপনারাও কাউকে বাঁচানোর দায়িত্ব নেবেন না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে, তার আদর্শ বাস্তবায়ন করতে এই অভিযান চলবে। আমি কাউকে রক্ষা করতে পারব না। অপরাধীকে শাস্তি পেতেই হবে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় গণভবনে দলের কয়েক নেতার সঙ্গে অনির্ধারিত এক বৈঠকে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা।
এর আগে গতকাল সকালে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে দেশের প্রথম কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১-এর মাধ্যমে দেশীয় সব টেলিভিশন চ্যানেলের বাণিজ্যিক সম্প্রচারের উদ্বোধনকালেও অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দলমত-আত্মীয়-পরিবার বলে কিছু নেই, কেউ ছাড় পাবে না।গণভবনের অনির্ধারিত ওই জরুরি বৈঠকে উপস্থিত একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দলের অনেকেই অনেককে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন। শ্রেষ্ঠ সংগঠক, ওমুক-তমুক বলে বিশেষণ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী খুব সিরিয়াস মুড নিয়ে এসব কথা বলেছেন।
এসব মেসেজ দেওয়ার জন্যই জরুরিভিত্তিতে অনির্ধারিত এই বৈঠক ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, মৌচাকে ঢিল মেরেছি, আমি জানি। শেল্টার দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। তিনি বলেন, সবার সব খবর আমার কাছে আছে। আমি যখন দেশের বাইরে ছিলাম গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, দলের ভেতরে পারমানেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি হিসেবে যারা জায়গা করে নিয়েছেন তাদের চিহ্নিত করে দল থেকে বের করে দিতে হবে। দলটা তাদের নয়। যারা ত্যাগী, বঞ্চিত তাদের জায়গা করে দিতে হবে। আওয়ামী লীগ সবার দল। ওয়ান ইলেভেনের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি তিতা খেয়ে তিতা হজম করেছি।
সম্প্রতি জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী দেশে ওয়ান-ইলেভেনের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। বলেন, সরকার আগে থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যাতে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় না ঘটতে পারে। আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, গতকাল গণভবনে প্রায় সোয়া এক ঘণ্টার ওই বৈঠকে শেখ হাসিনা আরও বলেন, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর গত ২৯ বছর দেশে কোনো উন্নয়ন হয়নি। মাঝখানে আমাদের পাঁচ বছরেও খুব একটা কিছু করতে পারিনি। আমাদের এই তিন মেয়াদে উন্নয়ন করতে পেরেছি বলেই আজ আমরা জনপ্রিয়। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে।
এ সময় ক্যাসিনো প্রসঙ্গে হাসতে হাসতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাসিনো খেলোয়াড়দের জন্য ভাসানচর উন্মুক্ত করে দেব। সেখানে যেতে পারে ব্যবসায়ীরা।তারা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ইঙ্গিত করে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে কেউ কোনো মন্তব্য করবেন না। তার ব্যাপারে নো কম্প্রোমাইজ। যারা খালেদাকে নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দেন তাদের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়েছেন শেখ হাসিনা। বৈঠকে ফেনীর সাবেক সাংসদ জয়নাল হাজারীকে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নির্বাচন করা হয়েছে বলেও জানান তারা।
বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বি এম মোজাম্মেল, খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে গণভবনের গেটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের জানান, আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের আগে ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই সব সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন করার নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতারা আওয়ামী লীগের আগামী কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাবেন।
আওয়ামী লীগের সমচিন্তার নয় এমন কেউ যাতে দলের ভেতরে অনুপ্রবেশ করতে না পরে সেজন্য সবাইকে সজাগ থাকতে বলেছেন সভানেত্রী। চলমান অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, কারও নাম উল্লেখ করে আলোচনা হয়নি। তবে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন নেত্রী। হোটেল সোনারগাঁওয়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতিবাজ যে দলেরই হোক ছাড় পাবে না, এমনকি পরিবারও। প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো গ্রহণ করার সময় বা বাস্তবায়নের সময় মাঝে মাঝে দেখি উইপোকা খেয়ে ফেলে। সরকার দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ উইপোকায় ধ্বংস করা থেকে রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
সরকারপ্রধান বলেন, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং রাখা হবে। সে যে-ই হোক না কেন? দলমত-আত্মীয়-পরিবার বলে কিছু নেই। যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই উইপোকাগুলো ধরা এবং বিন্যাস করা আর জনগণের কষ্টার্জিত পয়সা, প্রতিটি টাকা যেন সঠিকভাবে উন্নয়নে ব্যবহার হয়, তার জন্য প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চলতি বাজেটে ১৭৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছি।
দুর্নীতিবাজ উইপোকারা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকালে অর্থ লুটে নিচ্ছে। দেশের উন্নয়নের জন্য জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের প্রতিটি পয়সার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য আমাদের ওইসব উইপোকাকে আটক করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখব। এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকলে দল-পরিবার নির্বিশেষে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আমি দেশের দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় কোনো ধরনের অপপ্রচার না চালানোর জন্য গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অপপ্রচারগুলো সরকারের বিরোধিতার নামে মানুষের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টির পাশাপাশি দেশে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে আরেকটি আবেদন রাখতে চাই। আপনারা সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরুন, যাতে করে দেশবাসীর মনে সরকারের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি হয় এবং তারাও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলা, দুর্গম পাহাড়, চরাঞ্চল বা হাওরাঞ্চলের মানুষের কাছে টেলিমেডিসিন সেবা পৌঁছে দেওয়া, শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ই-এডুকেশন পদ্ধতি চালুর কথাও তুলে ধরেন। নিজস্ব স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১-এর মাধ্যমে সম্প্রচার শুরু হওয়ায় ইলেকট্রনিক সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর অনেক বাধা দূর হওয়ার আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে পরনির্ভরশীলতা থাকবে না।
আমরা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেলাম।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা আশপাশের দেশগুলোর কাছেও অফার করেছি। তারাও চাইলে এর ট্রান্সপন্ডার ভাড়া নিতে পারবে। এখান থেকেও আমরা অর্থ উপার্জন করতে পারব। এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক সহজে বার্তা পৌঁছাবে।’দ্বিতীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণেও দেশ তৈরি হচ্ছে আভাস দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘একটা স্যাটেলাইটের নির্দিষ্ট সময় থাকে ১৫ বছর। এর মধ্যে আরেকটি আমাদের আনতে হবে। এর মধ্যে পাঁচ বছর হয়ে গেছে। দ্বিতীয়টি তৈরি শুরু করেছি, সময় থাকতে নিয়ে আসব। সেটা আমরা একটু বড় আকারে করতে চাই।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে তার সন্তান এবং তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়েরও কৃতিত্ব তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ ডিজিটাল। আমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী, ডিজিটাল শব্দটি আমি জানতাম না। এটা আমাকে দিয়েছিল সজীব ওয়াজেদ জয়।১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর বেসরকারি খাতে টেলিভিশনকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তখন অনেকেই এত অভিজ্ঞ ছিল না, অতটা সাড়াও পাইনি। কিন্তু যারা চেয়েছিল তাদের সবাইকে টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমতি দিয়ে দিই।নৈতিকতাবিহীন কোনো দল জনগণকে কিছু দিতে পারে না : ভয়েস অব আমেরিকাকে প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে নিউ ইয়র্ক সফরকালে ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নৈতিকতাবিহীন কোনো দল জনগণকে কিছু দিতে পারে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশের স্বাধীনতা আনয়নকারী দল আওয়ামী লীগ সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করেছে। এ কারণেই জনগণ তাদের ভোট দিয়ে বারবার ক্ষমতায় এনেছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘কেবল উন্নয়ন টেকসই হলে সমাজ থেকে বৈষম্য দূরীভূত হবে। শিশু ও যুবকরা লোভ-লালসার দিকে না গেলে এবং তারা চমৎকার নৈতিকতা ও আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠলে তবেই সমাজ উচ্চতর নৈতিকতা ও আদর্শ সহকারে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, এই চিন্তাভাবনা থেকেই তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সম্পাদকীয়,বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৮/১, আরামবাগ,মতিঝিল-ঢাকা-১০০০
যোগাযোগ: মোবাইল ০১৭১৩-৩৩২১৫৯- ০১৩১৮-৬৮০৩৮১
আমাদেরবাংলাদেশ. ডট কম