
গত বুধবার (১০ জুন, ২০২৬) সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে এই প্রতিবেদক ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরেজমিন পরিদর্শনে যান। নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টা ৫ মিনিটে চিকিৎসকদের অফিস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় প্রায় সবগুলো চেম্বারই ফাঁকা। কোনো চেম্বারে কোনো ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন না।
এ বিষয়ে ডাক্তারদের সহকারীদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানান, চিকিৎসকরা ওপরের তলায় রোগী দেখছেন। এরপর ওপরে গিয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ কাজল মল্লিকের কাছে জানতে চাইলে তিনিও দাবি করেন, চিকিৎসকরা ওপরে রোগী দেখছেন। তবে ওপরে গিয়ে ডিউটিরত নার্স অর্চনার সাথে কথা বললে তিনি জানান, ডাক্তাররা রাউন্ডে (ওয়ার্ড পরিদর্শনে) আছেন। কিন্তু ওয়ার্ডে গিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর কেবল মেডিকেল অফিসার ডাঃ রিফাত সাহেবকে রোগী দেখতে পাওয়া যায়। অন্য কোনো ডাক্তারের দেখা মেলেনি।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, অনেক চিকিৎসকই সকালের দিকে হাসপাতালের কাছের বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখার কাজ সেরে, তবেই সরকারি হাসপাতালে এসে উপস্থিত হন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ভুক্তভোগী রোগী ও তাঁদের স্বজনরা জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; প্রতিদিনই এখানে একই চিত্র দেখা যায়। নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টায় অফিস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনেক ডাক্তার ১০টা, এমনকি ১১টায় হাসপাতালে আসেন। আবার দুপুর ১টা বাজতেই কর্মস্থল ছেড়ে চলে যান। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ কাজল মল্লিক প্রতিবেদকের কাছে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন: "আমাদের চিকিৎসকদের হাজিরা খাতায় উপস্থিতি থাকলেও কেন কয়েকজনকে কক্ষে পাওয়া যায়নি, সেটা আমরা খতিয়ে দেখব। হাসপাতালে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ইতোমধ্যে দায়িত্ব অবহেলার কারণে সংশ্লিষ্টদের প্রশাসনিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) করা হয়েছে এবং পরদিন তাঁরা এর জবাব দেবেন।"
ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই অনিয়মের বিষয়টি জেলার সিভিল সার্জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হলে তিনি সাংবাদিকদের ভূমিকাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন: "আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা এ বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করব। সাংবাদিকরা হাসপাতালে গিয়ে পরিদর্শন করুন-এটিকে আমরা স্বাগত জানাই এবং অত্যন্ত প্রশংসা করি।"
ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই চলমান অনিয়ম এবং সাংবাদিকদের সরেজমিন প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মিস সবিতা সরকার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:“সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের এই ধরনের অনুপস্থিতি এবং সাধারণ মানুষকে সেবা থেকে বঞ্চিত করার বিষয়টি কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। হাসপাতালের মতো একটি জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীরা এসে ঘুরে যাবে, আর চিকিৎসকরা প্রাইভেট ক্লিনিকে ব্যস্ত থাকবেন-এটি চরম দায়িত্বহীনতা।
বিষয়টি আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অলরেডি অভিযুক্তদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। আমরা তাঁদের জবাবের অপেক্ষায় আছি। তবে শুধু নোটিশেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে না; যদি সন্তোষজনক জবাব না পাওয়া যায়, তবে জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জনের সাথে সমন্বয় করে দোষী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও administrative (প্রশাসনিক) শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।“ইউএনও আরও যোগ করেন, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আগামীতে আকস্মিক পরিদর্শন (সারপ্রাইজ ভিজিট) আরও বাড়ানো হবে। ডুমুরিয়ার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসন 'জিরো টলারেন্স' নীতি অবলম্বন করবে।
সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত অনুপস্থিতি, প্রাইভেট ক্লিনিকে সমান্তরাল প্র্যাকটিস এবং রোগীদের সঙ্গে এই প্রতারণামূলক আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল। তাঁদের মতে, শুধু নামমাত্র শোকজ বা সাময়িক আশ্বাসের বৃত্তে ঘুরতে থাকলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। ডুমুরিয়াবাসীর একটাই দাবি-সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসন এখনই দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।
এবিডি.কম/রাজু
সম্পাদকীয়,বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৮/১, আরামবাগ,মতিঝিল-ঢাকা-১০০০
যোগাযোগ: মোবাইল ০১৭১৩-৩৩২১৫৯- ০১৩১৮-৬৮০৩৮১
আমাদেরবাংলাদেশ. ডট কম