প্রিন্ট এর তারিখ: জুন ১২, ২০২৬, ৯:৫৪ অপরাহ্ণ || প্রকাশের তারিখ: জুন ১২, ২০২৬, ৭:১৩ অপরাহ্ণ
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তি, অব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের কারণে বর্তমান সরকার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, অতীতে নেওয়া নানা সিদ্ধান্তের দায় এখন বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অতীতে বিনিয়োগকারীদের গ্যারান্টি দিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ চালু করা হয়েছিল।
এর ফলে প্রকল্পগুলো ব্যাংকঋণ পাওয়ার উপযোগী (ব্যাংকেবল) হয় এবং সেই সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। তবে এসব চুক্তি এমনভাবে করা হয়েছে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থই বেশি সংরক্ষিত হয়েছে, সরকারের পক্ষে তেমন কোনো সুবিধা রাখা হয়নি।
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা হলেও তারা এ সুবিধা থেকে সরে আসতে রাজি হচ্ছে না।
চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে তারা জানিয়েছে, ক্যাপাসিটি চার্জ বাতিল করা হলে ব্যাংকগুলো ঋণের অর্থ ফেরত চাইবে, ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না। আবার সরকার জোরপূর্বক এ ব্যবস্থা বন্ধ করলে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে নতুন করে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিতে পারে।
মন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। ইতিবাচক মতামত পাওয়া গেলে আইনগত পদক্ষেপ নিয়ে সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর যথাযথ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ না করে সেগুলোকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। বিপরীতে অধিকাংশ বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে বেসরকারি খাত থেকে। এর ফলে বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া জমেছে।
ডিজিটাল মিটার কেনায় প্রশ্ন
বিদ্যুৎ খাতের অনিয়মের উদাহরণ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) পাঁচ লাখ ডিজিটাল মিটার কেনার আদেশ দেয়। এর মধ্যে আড়াই লাখ মিটার দেশে আনার পর তিন বছরে মাত্র ৬৫টি মিটার সিঙ্ক্রোনাইজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাকি মিটারগুলো গুদামেই পড়ে থাকে। পরে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখা যায়, অবশিষ্ট আড়াই লাখ মিটারও জাহাজীকরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন এ আদেশ বাতিল করা হলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আদালতে গেলে জিতে যেতে পারে, কারণ জাহাজীকরণের নির্দেশ আরইবিই দিয়েছিল। তাঁর মতে, এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে।
ডিপিডিসির প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) পরিচালিত একটি প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ২০৪০ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপন ও নতুন সাবস্টেশন নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরের নভেম্বরে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৮টি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রকল্পের আওতার বাইরে শাহবাগ এলাকায় এসকাডা ভবনের জন্য সুইমিং পুল, জিমসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন টুইন টাওয়ার নির্মাণ করা হচ্ছে। অথচ ডিপিডিসি নিজে লাভজনক প্রতিষ্ঠান নয় এবং নিয়মিত সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছে, কোথাও ৫০ শতাংশ, কোথাও ৬০ শতাংশ, আবার কোথাও মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন এসব প্রকল্প বন্ধ করে দিলে ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে সরকারকে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, লুটপাট করে চলে যাওয়ার পর যে প্যাকেজগুলো আমাদের দিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেগুলো এখন আমাদের সামাল দিতে হচ্ছে। আমরা মাত্র তিন-চার মাস হলো সরকারে এসেছি। এসব সমস্যা সমাধানে আমাদের সময় দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক, অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।