প্রিন্ট এর তারিখ: জুন ১৪, ২০২৬, ১০:৫৬ অপরাহ্ণ || প্রকাশের তারিখ: জুন ১৪, ২০২৬, ৮:১৯ অপরাহ্ণ
শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া (খুলনা) থেকে।। আষাঢ়ের শুরুতেই খুলনাঞ্চলের নদী-নালা, খাল-বিল ও মৎস্য ঘেরগুলো নতুন পানিতে টইটম্বুর। আর বর্ষার এই আগমনের সঙ্গেই খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী চুকনগর হাটে জমে উঠেছে মাছ ধরার নানা রকমের জালের মেলা। বিশেষ করে মৎস্য ঘের অধ্যুষিত এই এলাকায় দেশি মাছ শিকারের প্রধান হাতিয়ার ‘ঝাঁকি জাল’ (খেপলা জাল)-এর চাহিদা এখন তুঙ্গে। হাটে ক্রেতা বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখরিত হয়ে উঠেছে জালের বাজার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডুমুরিয়া উপজেলাটি বিপুল সংখ্যক মৎস্য ঘের ও জলাশয় বেষ্টিত হওয়ায় এখানে সারাবছরই কম-বেশি জালের প্রয়োজন হয়। তবে বর্ষা موسم শুরু হলে নতুন পানিতে মাছ ধরার এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। পেশাদার জেলেদের পাশাপাশি শৌখিন মৎস্যশিকারিরাও এই সময়ে জাল কিনতে হাটে ভিড় করছেন। একেকটি বড় বা মাঝারি মৎস্য ঘেরে মাছ ধরার জন্য অন্তত ২ থেকে ৩টি জালের প্রয়োজন হয়,যার ফলে এই সময়ে ঝাঁকি জালের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়।
চুকনগর হাটের জালের বাজার ঘুরে দেখা যায়, সুতা ও বুননের গুণগত মান এবং আকার ভেদে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে ঝাঁকি জাল। বাজারের বর্তমান চিত্রটি নিম্নরূপ: গুণগত মান অনুযায়ী সর্বনিম্ন ২,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪,৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।১,০০০ থেকে ২,০০০ টাকার মধ্যে মিলছে। ঝাঁকি জালের পাশাপাশি হাটে চাক জাল (৩০০ থেকে ৪,০০০ টাকা) এবং কোনা জাল (৬০০ থেকে ১,২০০ টাকা) বেশ ভালো পরিমাণে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
হাটে আসা ডুমুরিয়ার এক মৎস্য চাষী জানান, "বর্ষার নতুন পানিতে ঘেরের মাছ লাফালাফি করে। এই সময়ে ঘের থেকে বা বাইরের খাল থেকে মাছ ধরার জন্য একটি ভালো মানের ঝাঁকি জালের দরকার ছিল। চুকনগর হাটে জালের সরবরাহ ভালো, দরদাম করে একটা মজবুত সুতার জাল কিনে নিলাম।"
শত বছর ধরে বংশানুক্রমিকভাবে জালের ব্যবসা করে আসা স্থানীয় এক বিক্রেতা বলেন, "আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই জালের ব্যবসা করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন ক্ষতিকারক কারেন্ট জালের অবৈধ ব্যবহার বাড়ায় দেশি সুতার জালের চাহিদা আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে, তবুও বর্ষার এই ২-৩ মাস আমাদের বেচাকেনা বেশ ভালো হয়। হাটে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ঝাঁকি জাল কিনতে আসেন।"
এ ব্যাপারে ডুমুরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মোঃ জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, "বর্ষা মৌসুমে ডুমুরিয়া এলাকার মৎস্য ঘের ও উন্মুক্ত জলাশয়গুলোতে মাছ ধরার এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। চুকনগর হাটের ঝাঁকি জালের এই বিপুল কেনাবেচা মূলত আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার প্রাচীন সংস্কৃতিকেই টিকিয়ে রেখেছে।" তিনি আরও যোগ করেন, "ঝাঁকি জাল বা খেপলা জালে সাধারণত ছোট বা পোনা মাছ খুব একটা আটকা পড়ে না, ফলে মাছের বংশবিস্তারে কোনো ক্ষতি হয় না। আমরা সবসময়ই মৎস্য চাষী ও সাধারণ মানুষকে কারেন্ট জাল বা চায়না দুয়ারির মতো নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকারক জাল বর্জন করে এই ধরনের বৈধ ও দেশীয় ঐতিহ্যবাহী জাল ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করে আসছি।"
এ প্রসঙ্গে খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ বদরুজ্জামান বলেন, "খুলনা জেলা মৎস্য সম্পদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। বর্ষার শুরুতে জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ হাটে দেশীয় জালের কেনাবেচা বাড়ে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে কোনোভাবেই যেন কারেন্ট জাল বা নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার না হয়, সেজন্য আমাদের নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমরা চাই জেলেরা এবং মৎস্য চাষীরা ঝাঁকি জালের মতো বৈধ ঐতিহ্যবাহী উপকরণ ব্যবহার করে মৎস্য খাতের এই ধারাকে সমৃদ্ধ রাখুক।"কারেন্ট জালের আগ্রাসনের মধ্যেও গ্রামীণ ঐতিহ্য ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে মাছ ধরার এই প্রাচীন মাধ্যমটিকে টিকিয়ে রেখেছেন চুকনগর হাটের কারিগর ও বিক্রেতারা। বর্ষার এই ভরা মৌসুমে জালের ভালো দাম পাওয়ায় বিক্রেতাদের মুখে যেমন হাসি ফুটেছে, তেমনি পছন্দের জাল কিনতে পেরে সন্তুষ্ট সাধারণ ক্রেতারাও।
এবিডি.কম/রাজু