আমাদের বাংলাদেশ
✉️ dailyamaderbd24@gmail.com f https://facebook.com/Dailyamaderbangladesh
প্রিন্ট এর তারিখ: July 13, 2026, 4:50 pm || প্রকাশের তারিখ: July 13, 2026, 2:32 pm
২৫ বছরের নীরবতা থামলো ৪৪ হাজারে: মেথিকান্দা স্টেশনের ‘বুবি’ আর নেই
২৫ বছরের নীরবতা থামলো ৪৪ হাজারে: মেথিকান্দা স্টেশনের ‘বুবি’ আর নেই
মোস্তাবিন সিয়াম বিশেষ প্রতিনিধি

 

পঁচিশ বছর আগে একটা ট্রেন এসে থেমেছিল মেথিকান্দা স্টেশনে। সেই ট্রেন থেকে নেমেছিলেন বাকপ্রতিবন্ধী এক বৃদ্ধা। তিনি কোথা থেকে এসেছিলেন, কেন এসেছিলেন, কিংবা কোনো আপনজনের প্রতি গভীর অভিমান বুকে নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন কিনা—সেসব কথা আর কোনোদিন জানা যাবে না।

স্টেশনের চেনা-অচেনা শত শত মানুষের ভিড়ে কেউ তাঁর নাম জানত না, জানত না তাঁর ঠিকানা বা পরিচয়। তবে সবার কাছে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন একটি মায়াবী নামে—“বুবি”।

প্ল্যাটফর্মের এক কোণে কেটে গেল ২৫ বছর

শুরুর দিনগুলোতে বুবি প্ল্যাটফর্মের এক কোণে চুপচাপ বসে থাকতেন। কারও কাছে হাত পাততেন না, কিছু চাইতেন না। নিজের মতো করে প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দিতেন, পরিষ্কার রাখতেন। তাঁর কোনো কণ্ঠ ছিল না, তাই সমাজ বা মানুষের প্রতি কোনো অভিযোগও জানাতে পারতেন না। ছিল শুধু দুটি ক্লান্ত, নিঃসঙ্গ চোখ।

দিন গেছে, বছর গড়িয়েছে। স্টেশনে নতুন নতুন মানুষ এসেছে, পুরোনোরা হারিয়ে গেছে। ট্রেনের ইঞ্জিন বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি এই নিঃসঙ্গ বৃদ্ধার জীবন। প্রতিদিনের মতো সূর্য উঠেছে, ট্রেন এসেছে, ট্রেন চলে গেছে, আর বুবি নীরবে বসে থেকেছেন মেথিকান্দার সেই একই চেনা প্ল্যাটফর্মে।

 

এই দীর্ঘ ২৫ বছরে একটু একটু করে বুবি জমিয়েছিলেন মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা। প্রতিদিনের হিসেবে যা চার থেকে পাঁচ টাকার বেশি নয়।

কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি, কেন তিনি প্রতিটি টাকা এত যত্ন করে আগলে রাখতেন। হয়তো কোনো গোপন স্বপ্ন ছিল, হয়তো বা ছিল না। অথবা হয়তো এই সহজ বিশ্বাসটুকু ছিল—মানুষ যখন বুড়ো হয়ে যায়, শেষ সময়টাতে যেন অন্তত নিজের উপার্জিত টাকায় মাথা গোঁজার বা দুমুঠো ভাতের সংস্থান করা যায়।

আমাদের আধুনিক সমাজের কাছে এই চল্লিশ হাজার টাকার মূল্য হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু একজন মানুষের জীবনের ২৫টি বছর যদি টাকার অঙ্কে মাপা যায়, তবে সেই চল্লিশ হাজার টাকার দাম ছিল তাঁর পুরোটা জীবন।

 

কিন্তু মানুষের লোভের কাছে হেরে গেল বুবির ২৫ বছরের জীবন। কিছু মানুষরূপী পিশাচ সেই সামান্য টাকাগুলোর জন্যই তাঁকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করল।
ভাবুন তো, কথা বলতে পারলে শেষ মুহূর্তে তিনি কী বলতেন? কাকে ডাকতেন? মাকে? বাবাকে? নাকি সৃষ্টিকর্তাকে?
আমরা কোনো উত্তর জানি না। কারণ, বুবি জীবনে কখনো কোনো উত্তর দিতে পারেননি। মৃত্যুর আগে ক্ষতবিক্ষত মুখ নিয়ে তিনি নীরবে স্টেশনের একটি চেয়ারে বসে ছিলেন। হয়তো তিনি শেষ মুহূর্তেও বুঝতে পারছিলেন না, এই সভ্য সমাজের মানুষের কাছে তাঁর আস্ত একটা জীবনের দাম চল্লিশ হাজার টাকার চেয়েও কম!

ক্ষমা করো না বুবি...

তাঁর জন্য হয়তো কোনো বড় শোকসভা হবে না। তাঁর হত্যার বিচার চেয়ে রাজপথে কোনো মিছিল কিংবা ব্যানারও দেখা যাবে না। হয়তো নিয়তি মেনে তাঁর কবরে একটা নামফলকও লেখা থাকবে না।

কিছুদিন পর স্টেশনের মানুষজনও দৈনন্দিন ব্যস্ততায় তাঁকে ভুলে যাবে। নতুন ট্রেন আসবে, নতুন যাত্রী নামবে, নতুন কোনো গল্প তৈরি হবে। শুধু মেথিকান্দা প্ল্যাটফর্মের এক কোণ হয়তো অনেকদিন নীরবে মনে রাখবে—এখানে এক বৃদ্ধা বসতেন। তিনি কথা বলতে পারতেন না, কিন্তু তাঁর সেই নীরবতাই ছিল হাজারটা আর্তনাদের চেয়েও ভারী।

কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে এবং চলে যায় অনেক শব্দ করে। আর বুবির মতো কিছু মানুষ চলে যায় এতটাই নীরবে, যেন তারা কোনোদিন এই নির্মম পৃথিবীতে ছিলই না।

হে পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব মানুষ, আমাদেরকে তুমি ক্ষমা করো না...।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৮/১, আরামবাগ, মতিঝিল-ঢাকা-১০০০
যোগাযোগ: মোবাইল ০১৭১৩-৩৩২154- ০১৩১৮-৬৮০০৮১
আমাদেরবাংলাদেশ. ডট কম