মনে করো তুমি স্বপ্ন দেখতেছ”—শিশুকে বলাৎকারের পর শিক্ষকের সাফাই, সালিশ দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা
নাঈম বিশ্বাস, কুষ্টিয়া
“১২ তারিখ সকালে ঘুমাইয়া ছিলাম। হুজুর এসে আমার সাথে জিনা (বলাৎকার) করে। চোখ খুলতেই হুজুর মাথায় হাত দিয়ে বলে—মনে করো তুমি স্বপ্ন দেখতেছ।”
১০ বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীর আকুতি ভরা এই বয়ানেই থমকে গেছেন সবাই। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা জঘন্য এই বলাৎকারের অভিযোগ চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল স্থানীয়ভাবে ‘সালিশ বৈঠক’ বসিয়ে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; জনরোষ আর পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন অভিযুক্ত শিক্ষক। উদ্ধার করা হয়েছে ভুক্তভোগী শিশু ও তার পিতাকে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে কুমারখালী উপজেলার সদকী ইউনিয়নের তালোয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিং থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক মো. মোস্তাফিজুর রহমান (২৫)-কে আটক করে কুমারখালী থানা পুলিশ। আটক মোস্তাফিজুর ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার তাহেরহুদা এলাকার বাসিন্দা।
যেভাবে প্রকাশ্যে এলো ঘটনা
ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ জুলাই সকালে। সেদিন মাদ্রাসার বড় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে বাইরে গিয়েছিল। ফাঁকা মাদ্রাসায় ঘুমিয়ে ছিল পাঁচ শিশু। সকাল ১১টার দিকে সুযোগ বুঝে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে জোরপূর্বক বলাৎকার করেন মাদ্রাসার শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান। ঘটনাটি অন্য শিশুরা দেখে ফেললেও ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছিল।
ঘটনার আকস্মিকতা সামলে ওঠার আগেই বিষয়টি জানাজানি হতে থাকে। মুখ বন্ধ রাখতে মঙ্গলবার দুপুরে এক শিশুকে বেধড়ক মারধর করেন ওই শিক্ষক। চড়-থাপ্পড় আর মারধরের শব্দে স্থানীয়দের সন্দেহ হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে, ফাঁস হয়ে যায় বলাৎকারের নির্মম সত্য।
ধামাচাপা দিতে বিএনপির নেতাসহ পরিচালনা পর্ষদের 'সালিশি নাটক'
আইন ভেঙে ফৌজদারি অপরাধকে স্থানীয়ভাবে ‘রফা-দফা’ করার উদ্দেশ্যে মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেই সালিশ বসান পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি মো. জুলফিকার মাহমুদ এবং পার্শ্ববর্তী জগন্নাথপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও কমিটির সহ-সভাপতি আব্দুল করিমসহ অন্যান্য মাতব্বররা।
সাংবাদিকরা সরেজমিনে বিকেলে তালোয়া মাদ্রাসায় পৌঁছালে চাঞ্চল্যকর দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়েই তড়িঘড়ি করে সালিশ কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছুণ পর বের হয়ে বারান্দায় বসে চলে আলোচনা। ফৌজদারি অপরাধে সালিশ বসানোর বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসা সভাপতি নির্দ্বিধায় দাবি করেন, "বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার সুযোগ রয়েছে।"
উৎসুক জনতার ভিড় ও পুলিশের অ্যাকশন
ঘটনা জানাজানি হলে স্থানীয় শত শত উৎসুক জনতা মাদ্রাসায় ভিড় জমায়। খবর পেয়ে কুমারখালী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে অভিযুক্ত শিক্ষক মোস্তাফিজুরকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। যদিও আটকের পর সব দায় অস্বীকার করে শিক্ষক দাবি করেন, শিক্ষার্থীরা নাকি ‘মিথ্যা তথ্য’ দিচ্ছে।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান:
"বলাৎকারের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে আইনগতভাবে কোনো প্রকার সালিশ বৈঠকের সুযোগ নেই। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ গিয়ে অভিযুক্তকে আটক করেছে। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে এবং মামলাসহ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।"
সম্পাদকীয়,বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৮/১, আরামবাগ,মতিঝিল-ঢাকা-১০০০
যোগাযোগ: মোবাইল ০১৭১৩-৩৩২১৫৯- ০১৩১৮-৬৮০৩৮১
আমাদেরবাংলাদেশ. ডট কম