প্রিন্ট এর তারিখ: August 14, 2026, 9:42 pm || প্রকাশের তারিখ: August 14, 2026, 7:04 pm
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই আফগানিস্তানে মেয়েদের শিক্ষাজীবনে নেমে এসেছে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা। এরই মধ্যে দেশটিতে প্রায় ২৪ লাখ মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরই মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত মেয়ের সংখ্যা আরও প্রায় দুই লাখ বেড়েছে। বর্তমান নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখে পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটির আশঙ্কা, এত বিপুলসংখ্যক মেয়ের দীর্ঘদিন শিক্ষা থেকে দূরে থাকা আফগানিস্তানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ইউনেস্কোর ‘জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষা’ কর্মসূচির সমন্বয়কারী হোদা জাবেরিয়ান পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, আফগানিস্তানই বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের ও নারীদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তিনি বলেন, একটি শিশুর শিক্ষাজীবনে পাঁচ বছর কোনোভাবেই সাময়িক বিরতি নয়; এটি মাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় পুরো একটি পর্যায়ের সমান সময়।
নিষেধাজ্ঞার শুরু যেভাবে
দুই দশকের যুদ্ধের পর ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে তালেবান। ক্ষমতায় ফেরার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল গোষ্ঠীটি। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই অবস্থানে পরিবর্তন আসে।
২০২২ সালের মার্চে মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে তালেবান সরকার। একই বছরের ডিসেম্বরে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তখন এসব পদক্ষেপকে সাময়িক বলা হলেও কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি।
তালেবান কর্তৃপক্ষের দাবি, ইসলামি আইন ও আফগান সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই নারীদের অধিকার নির্ধারণ করা হচ্ছে। তবে শিক্ষা ছাড়াও কর্মসংস্থান, চলাফেরা ও জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
শিক্ষার বাইরেও বাড়ছে বিধিনিষেধ
নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। আফগান নারীদের কর্মসংস্থান ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। এমনকি পাবলিক পার্ক, জিম ও বিউটি স্যালনের মতো বিভিন্ন স্থানেও নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
জাতিসংঘ তালেবানের এসব সামগ্রিক নীতিকে ‘লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক সমালোচনা ও উদ্বেগের মধ্যেও নীতিগুলোতে বড় কোনো পরিবর্তন আনেনি তালেবান প্রশাসন।
ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও তালেবান প্রশাসন অনেকটা বিচ্ছিন্ন। এখন পর্যন্ত রাশিয়াই একমাত্র দেশ, যারা তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
মেয়েদের শিক্ষার ওপর দীর্ঘমেয়াদি এই নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবনকেই থামিয়ে দিচ্ছে না; এর প্রভাব ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের মানবসম্পদ, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহল।