প্রিন্ট এর তারিখ: August 20, 2026, 7:12 am || প্রকাশের তারিখ: August 20, 2026, 12:15 am
পুলিশের ভয়ভীতি ও ঘুষ বাণিজ্যে আতঙ্কে পরিবার, শ্যামনগরে চরম উদ্বেগ
বিশেষ প্রতিনিধি:
জমি সংক্রান্ত বিরোধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, ধানক্ষেতের ধান নষ্ট করা এবং বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের হুমকির মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। শ্যামনগর থানার এসআই আমির ও এএসআই ইমরান হোসেনের এমন আচরণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারটি। এই ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ সুপার (এসপি) বরাবর মৌখিক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।মামলার বিবরণ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্যামনগর উপজেলার কাশীমাড়ী মৌজায় পৈতৃক সূত্রপ্রাপ্ত ৩৪ শতক জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জবরদখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল স্থানীয় একটি প্রভাবশালী পক্ষ। এ নিয়ে মো. হাশেম আলী বাদী হয়ে ১৮৮১ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় আদালতে মামলা দায়ের করেন (এস.এ দাগ নং ২৩২, খতিয়ান ৮২৯)। পরবর্তীতে বিবাদী পক্ষ আলাউদ্দিন গং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৭ ধারায় আরেকটি মামলা দায়ের করলে বিষয়টি তদন্তে নামে পুলিশ।
অভিযোগ উঠেছে, শ্যামনগর থানার এএসআই ইমরান হোসেন নোটিশ জারির নামে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পুলিশের প্রত্যক্ষ শক্তিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তিনি বাদী পক্ষের ধানক্ষেতের উঠতি ধান উঠিয়ে ফেলে দেন বলে ভুক্তভোগীরা জানান।
ঘটনার সুরাহার উদ্দেশ্যে হাশেম আলীর ভাইপো ও সাতক্ষীরা কোর্টের সহকারী আইনজীবী মোহরী হাসনাত হাসু শ্যামনগর থানায় যোগাযোগ করেন। বিষয়টি সমাধানের জন্য দিন ধার্য করার আশ্বাস দিয়ে এসআই আমির ও এএসআই ইমরান তাঁর কাছে ৭,০০০ টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে একটি বিকাশ এজেন্ট নম্বরের মাধ্যমে তাঁদের ৪,৫০০ টাকা প্রদান করা হয়। টাকা আদান-প্রদানের এই প্রক্রিয়ার অডিও কল রেকর্ড ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
পরবর্তীতে হাসনাত হাসু আদালত থেকে জারি করা ১৪৫ ধারার নোটিশটি যথাযথভাবে কার্যকর করার জন্য অনুরোধ জানালে উক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁকে ফোন দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে গালিগালাজের বিষয়টি টের পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তা ইমরান কলটি কেটে দেন, যার আংশিক রেকর্ডও সংরক্ষিত আছে।
অভিযোগ রয়েছে, এরপরই এসআই আমির ও এএসআই ইমরান কাশীমাড়ী বাজারে গিয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, সুবহান কবিরাজের ছেলে হাসনাত হাসুকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করা হবে। এছাড়া তাঁর ফোন ট্র্যাকিংয়ে রেখে ধরা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।
পুলিশের এমন হুমকির মুখে ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ সুবহান কবিরাজ। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "আমার বয়স ৬৫ বছর। কোনো মামলা বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই পুলিশ আমাকে ও আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। আমি ঠিকমতো বাড়ি থাকতে পারছি না।"
অন্যদিকে, আইনজীবী মোহরী হাসনাত হাসু বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, হাসুর স্ত্রী বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা (প্রেগনেন্ট) এবং তাঁর সন্তান প্রসবের সময় অত্যন্ত নিকটবর্তী। এ অবস্থায় পুলিশের অব্যাহত হুমকি-ধামকি ও হয়রানিতে পরিবারটি গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
পুলিশের এই অনৈতিক আচরণ ও ঘুষ বাণিজ্যের ঘটনায় ইতিমধ্যেই খুলনার ডিআইজি এবং সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার বরাবর মৌখিক অভিযোগ জানানো হয়েছে। পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
একজন সাধারণ নাগরিককে প্রশাসনিক ভয়ভীতি দেখানো এবং উৎকোচ গ্রহণের মতো অপরাধের বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযুক্ত এসআই আমির ও এএসআই ইমরান হোসেনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন এলাকাবাসী।