প্রিন্ট এর তারিখ: September 17, 2026, 1:02 pm || প্রকাশের তারিখ: September 17, 2026, 11:26 am
ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর উপকূলে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিজেদের সামরিক প্রভাব বিস্তার করেছে আনসারুল্লাহ (হুতি) বাহিনী। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে সানামুখী সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রাকে বিভ্রান্ত করতে হুতিরা প্রথমে ভিন্নমুখী হামলা চালায়। পরবর্তীতে ৫ সেপ্টেম্বর সরকারি বাহিনী হাইস দখল করলে হুতিরা উপকূল ধরে দক্ষিণাঞ্চলে দ্রুত অগ্রসর হয় এবং ঘেরাও এড়াতে সরকারি বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
১০ সেপ্টেম্বর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর দখলের পরদিন পেরিম দ্বীপ (মাইয়ুন), ধুবাব, হানিশ দ্বীপপুঞ্জসহ তাইজ ও হুদায়দাহ প্রশাসনিক অঞ্চলের ছয়টি উপজেলার প্রায় ৫,৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় তারা।
এই ভৌগোলিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিশ্ববাণিজ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল রুট ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলার ক্ষমতা অর্জন করেছে হুতিরা। এর মাধ্যমে তারা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং সৌদি আরবের ওপর রাজনৈতিক দরকষাকষির চাপ বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে সানায় বিমান চলাচল ও হুদায়দাহ বন্দরে নৌ চলাচলের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং সরকারি বাহিনীকে দেওয়া সৌদি সমর্থন বন্ধের দাবি জোরদার করার সুযোগ পেয়েছে তারা। এছাড়া সমুদ্রপথে ইরানি অস্ত্র, সরঞ্জাম ও সামরিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ইরান সমর্থিত 'অক্ষশক্তি'তে তাদের অবস্থান আরও সংহত হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উপকূলীয় এই সাফল্য সাময়িকভাবে কৌশলগত সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা হুতিদের জন্য বড় ‘কৌশলগত ফাঁদ’ হয়ে উঠতে পারে। এতদিন পাহাড়ি অঞ্চলে লুকিয়ে থেকে ঝটিকা আক্রমণ ও সহজে স্থান পরিবর্তনযোগ্য অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে লড়াই করলেও, তিহামার সমতল ও উন্মুক্ত উপকূলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে তাদের ভিন্ন কৌশলে যেতে হবে। এর ফলে প্রতিপক্ষের বিমান ও নৌ হামলার কাছে তারা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।
শেষ পর্যন্ত উপকূল রক্ষা করা নাকি রাজধানী সানার সামরিক অবস্থান ধরে রাখা—হুতিদের জন্য এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ২০১৭ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহায়তায় পরিচালিত 'অপারেশন গোল্ডেন অ্যারো'র মাধ্যমে মোখা থেকে হুতিদের বিতাড়নের ঘটনা এর বড় উদাহরণ।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার দিক থেকেও বাব আল-মানদেব প্রণালী অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্বের মোট খনিজ তেল বাণিজ্যের প্রায় ৮ শতাংশ এবং সামগ্রিক আন্তর্জাতিক পণ্যের ১৫ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিচালিত হয়, যা ভূমধ্যসাগর, সুয়েজ খাল ও এশিয়ার মধ্যকার প্রধান যোগাযোগসূত্র। হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকি এড়িয়ে এশীয় অঞ্চলে খনিজ তেল রপ্তানির জন্য এটি সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। হুতিদের এই আধিপত্য আমেরিকান যুদ্ধজাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলও তাদের অন্যতম বাণিজ্য রুট হিসেবে এই প্রণালীর ওপর নির্ভর করে; ইতোমধ্যে হুতিদের হামলায় তাদের এইলাত বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংকটের সময় হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—উভয় প্রণালী একযোগে অবরুদ্ধ করে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দেখছে ইরান।
তবে নতুন এই ৫,৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা হুতিদের জন্য লজিস্টিক দিক থেকে সহজ হবে না। হুদায়দাহ থেকে মোখা হয়ে মাইয়ুন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উন্মুক্ত রুট পাহারা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন, তাও আবার যখন হুতিদের নিজস্ব কোনো শক্তিশালী নৌবাহিনী নেই। এর জবাবে প্রতিপক্ষ সরকারি বাহিনীও পুরোপুরি নিস্তেজ নয়। বড় ধরনের ক্ষতি এড়িয়ে তারা তাইজ, এডেন ও মারিব অঞ্চলে অবস্থান ধরে রেখেছে।
আগামী দিনে সরকারি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ঐক্য, আঞ্চলিক মিত্রদের সদিচ্ছা এবং বিদেশি বিমান ও নৌ সহায়তা পাওয়া গেলে হুতিদের এই অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়া সম্ভব হলেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বাব আল-মানদেবে প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ হুতিদের হাতে থেকেই যাচ্ছে।