প্রিন্ট এর তারিখ: September 30, 2026, 11:41 pm || প্রকাশের তারিখ: September 30, 2026, 10:31 pm
কালীগঞ্জে নাশকতা মামলায় জামিনে জেল থেকে বেরোনোর ১৪ ঘন্টায় প্রধান শিক্ষক শফিকুলের বরখাস্ত প্রত্যাহার
কালীগঞ্জে নাশকতা মামলায় জামিনে জেল থেকে বেরোনোর ১৪ ঘন্টায় প্রধান শিক্ষক শফিকুলের বরখাস্ত প্রত্যাহার
(সাতক্ষীরা) প্রতিনিধিঃ
সরকার উৎখাত ও নাশকতা মামলায় আটকের ৪৩ দিন জেল হাজত খেটে জামিনে মুক্তি লাভের ১৪ ঘণ্টার মধ্যে মোটা অংকের অর্থ বাণিজ্যে প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের সাময়িক বরখাস্তাদেশ যশোর শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন না নিয়েই অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে প্রত্যাহারের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সাবেক উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক ও এডহক কমিটির সভাপতি আলাউদ্দিন সোহেলের বিরুদ্ধে।
১৫ আগস্ট রাতে গ্রেপ্তার হয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর আদালতের জামিনে সাতক্ষীরা জেলা কারাগার থেকে মঙ্গলবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৮ টার দিকে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে আসে । তার পরদিন বুধবার(২৯ সেপ্টেম্বর) সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কালিগঞ্জ আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি আলাউদ্দিন সোহেলের ডাকা জরুরী সভায় বেলা ১০ টার দিকে প্রধান শিক্ষক জিএম শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটে। এর আগে একাধিক নাশকতা মামলায় গ্রেফতার হয়ে হাজতবাস করলেও তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বরখাস্ত না করাকে কেন্দ্র করে নানান আলোচনা সমালোচনার ঝড় ওঠে। তড়িঘড়ি করে বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহারের ঘটনার কথা স্বীকার করে এডহক কমিটির সভাপতি বহিষ্কৃত সাবেক যুবদল নেতা অর্থ বাণিজ্যের বিষয়টি অস্বীকার করে জানান নিয়মতান্ত্রিকভাবে সাময়িক বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। তবে বোর্ডের অনুমতির বিষয়ে কোনো সদুত্তর মেলেনি।
অত্র বিদ্যালয়ের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিনের নিকট জানতে চাইলে তিনিও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়টি স্বীকার করেন। উপজেলা মাধ্যমিক ( অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) শিক্ষা কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন প্রথমে কিছু জানেন না বলে স্কুল থেকে জেনে জানান ফৌজদারি নাশকতা, দেশদ্রোহী মামলা না নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত বোর্ডের অনুমতি ব্যতীত বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করার কোন সুযোগ নাই সভাপতি। সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আলমগীর কবির জানান বিষয়টি আমার জানা নাই তবে নাশকতা মামলা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়া বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করার কোন সুযোগ নাই যদি করে থাকে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এবং সভাপতির বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ফারুখে আজম মোহাম্মদ আব্দুস সালামের নিকট জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিনিধিকে জানান ফৌজদারি ,নাশকতা, দেশদ্রোহী মামলায় জেল হাজতে গেলে ঐ শিক্ষককে আগে সাময়িক বরখাস্ত করতে হবে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া ঐ সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহার করার কোন সুযোগ নাই। এর ব্যত্যয় ঘটলে বিধি মোতাবেক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও সভাপতির পদ বাতিলসহ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তিনি আরো জানান নাশকতা বা রাষ্ট্রবিরোধী গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত কোনো শিক্ষকের বরখাস্তের আদেশ জেল থেকে বের হওয়ার পরদিনই প্রত্যাহার করে নেওয়া আইনি ও প্রশাসনিক বিধিমালা অনুযায়ী বৈধ নয়। বাংলাদেশ সরকারের চাকরি বিধি এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা অনুযায়ী এ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।
নিচে এই নিয়মের মূল প্রশাসনিক ভিত্তি ও আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো:
১. সাময়িক বরখাস্ত, প্রত্যাহারের আইনি নিয়ম ও কারাবাসের নিয়ম: কোনো সরকারি বা এমপিওভুক্ত বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে বা হাজতে গেলে , তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা কর্তৃপক্ষের আদেশে সাময়িক বরখাস্ত (Suspension) বলে গণ্য হন।
জামিনে মুক্তি বনাম বরখাস্ত প্রত্যাহার: জেল থেকে জামিনে বা খালাসে মুক্তি পেলেই বরখাস্তের আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। জেল থেকে বের হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের (যেমন: ম্যানেজিং কমিটি বা শিক্ষা অধিদপ্তর) কাছে লিখিত আবেদন করতে হয়।
২. কেন দ্রুত প্রত্যাহার আইনি প্রশ্নবিদ্ধ?
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন: সরকারের বিরুদ্ধে নাশকতা বা উৎখাত ষড়যন্ত্রের মতো রাষ্ট্রদ্রোহী ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হয়। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের আগে বা মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তড়িঘড়ি করে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা নিয়মবহির্ভূত।
বোর্ডের অনুমোদন: বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি কোনো শিক্ষকের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা কোনো আদেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করতে চাইলে তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির (Appeal and Arbitration Committee) অনুমোদন বা অবহিতকরণের প্রয়োজন পড়ে।
৩. মামলা চলমান থাকা অবস্থায় করণীয়ঃ আদালত কর্তৃক মামলা থেকে সম্পূর্ণ দোষমুক্ত বা খালাস (Acquitted) না পাওয়া পর্যন্ত গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো শিক্ষককে সপদে পুনর্বহাল বা তার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। কেবল জামিন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে তিনি অপরাধ থেকে মুক্তি পেয়েছেন, জামিন কেবল আদালতের প্রক্রিয়া চলাকালীন কারাগারের বাইরে থাকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সুবিধা।
সারসংক্ষেপ: যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে গুরুতর রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধের আসামির বরখাস্তের আদেশ জেল থেকে বের হওয়ার পরদিনই নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রত্যাহার করা হয়, তবে সংক্ষুব্ধ পক্ষ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ (যেমন: জেলা শিক্ষা অফিসার বা শিক্ষা বোর্ড) সেই আদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে এবং প্রয়োজনে বিজ্ঞ হাইকোর্টে রিট পিটিশনের মাধ্যমে এর আইনি বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।