বোনকে হারানোর কষ্ট থেকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন
দুর্গম পাহাড়ের বাধা পেরিয়ে ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রথম নারী চিকিৎসক সংচাং
মোঃমাঈনুদ্দিন বান্দরবান প্রতিনিধি :
দুর্গম পাহাড়ের প্রত্যন্ত এক জনপদ। চারদিকে পাহাড় আর জুমচাষনির্ভর জীবন। অভাব-অনটনের সঙ্গে নিত্যদিনের লড়াই। তার ওপর চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা। শৈশবেই চিকিৎসার অভাবে বোনকে হারানোর বেদনা এবং মায়ের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা কিশোরী সংচাং ম্রোর মনে জন্ম দেয় একটি স্বপ্ন—একদিন তিনি চিকিৎসক হবেন। পাহাড়ের মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।
সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথটা ছিল সহজ নয়। কখনো অর্থের সংকট, কখনো পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশের অভাব, আবার কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব বাধা পেরিয়েই এগিয়ে গেছেন তিনি। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, বাবার প্রচেষ্টা এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন সংচাং ম্রো।
দুর্গম পাহাড়ের ম্রো জনগোষ্ঠীর একটি পরিবার থেকে উঠে আসা সংচাং এখন অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার নাম।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বান্দরবান জেলায় ম্রো জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ৫৩ হাজার। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসের কারণে এই জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষের কাছেই শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা এখনো সহজলভ্য নয়। এমন বাস্তবতার মধ্যেই সংচাং ম্রোর চিকিৎসক হয়ে ওঠার গল্পটি সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও সম্ভাবনার এক অনন্য উদাহরণ।
মাটিতে-কলাপাতায় পড়াশোনার হাতেখড়ি
সংচাং ম্রোর বাড়ি বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাইয়া কারবারি পাড়ায়। তার বাবা কাইংপ্রে ম্রো এবং মা তুমলেং ম্রো।
সংচাংয়ের পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়েছিল বাবার কাছেই। জুমচাষের কাজের ফাঁকে বাবা কখনো মাটিতে, কখনো কলাপাতায় অক্ষর লিখে মেয়েকে পড়াতেন। চিকিৎসার অভাবে এক মেয়েকে হারানোর কষ্ট এবং স্ত্রীর দীর্ঘদিনের অসুস্থতা থেকেই কাইংপ্রে ম্রোর মনে জন্ম নেয়—সন্তানদের অন্তত একজনকে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তুলবেন।
গ্রামে বিদ্যালয় না থাকায় মেয়ের পড়াশোনার জন্য তাকে বাড়ি থেকে দূরের লামা মিশন হোস্টেলে ভর্তি করান বাবা। পরে সেই হোস্টেল বন্ধ হয়ে গেলে ফাদার লুপির পরিচালিত তৈদাং হোস্টেলে ভর্তি করা হয় সংচাংকে। সেখান থেকে চম্পটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পরে আলীকদম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন তিনি।
পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করেন সংচাং। তখন থেকেই তার স্বপ্নের পরিধি আরও বড় হতে থাকে।
অর্থের অভাব থামাতে পারেনি স্বপ্ন
আলীকদমে বিজ্ঞানের উপযুক্ত শিক্ষক না থাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে যেতে হয় সেন্ট যোসেফস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে। অর্থনৈতিক সংকট থাকলেও শিক্ষক, শিক্ষিকা ও সিস্টারদের সহযোগিতায় চলতে থাকে তার পড়াশোনা।
এসএসসি পরীক্ষার পর হলিক্রস কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলেও অর্থের অভাবে প্রথমে ভর্তি হতে পারেননি সংচাং। সেই সময়ের স্মৃতি এখনো তার মনে দাগ কেটে আছে।
পরে নমিতা সিস্টারের সহযোগিতায় আবার কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি। বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ করে দেন কলেজের শিক্ষকরা। মেরি মার্গারেট সিস্টার মাঝেমধ্যে হাতখরচও দিতেন।
এইচএসসি পরীক্ষার পরও অর্থনৈতিক সংকট কাটেনি। বাড়িতে ফিরে না গিয়ে কলেজেই থেকে দুই ভাই-বোনকে পড়াতেন সংচাং। সেই টাকায় মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতি নিতেন।
বাবা তাকে বাড়ি ফিরে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সংচাং ছিলেন নিজের সিদ্ধান্তে অটল। মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরবেন না—এমন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি।
অবশেষে পূরণ হলো স্বপ্ন
দীর্ঘ অপেক্ষা ও কঠোর পরিশ্রমের পর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। রাঙামাটি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান সংচাং ম্রো। তার ভাষায়, সেটিই ছিল জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন।
রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে একই কলেজে ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সংচাং।
মেডিকেলে ভর্তির পর বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা, সুবর্ণা ভূমি ফাউন্ডেশন, বিএসএসবির কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাকে সহযোগিতা করেন। সিনিয়র ভাই-বোনেরাও বই-খাতা ও বৃত্তি দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
পাহাড়ের মানুষের জন্য চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন
নিজের জীবনের সংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছেন সংচাং। চিকিৎসার অভাবে আপনজনকে হারানোর কষ্টও তার জানা। তাই চিকিৎসক হওয়ার পর তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—পাহাড়ের মানুষ যেন চিকিৎসার অভাবে আর প্রাণ না হারায়।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে চান তিনি। বিশেষ করে নিজের ম্রো জনগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করে তাদেরও উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন সংচাং।
আলীকদম-নাইক্ষ্যংছড়ি ম্রো কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক থং প্রে ম্রোর ভাষ্য, সংচাং ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রথম নারী চিকিৎসক। তার এই অর্জন পুরো ম্রো জনগোষ্ঠীর জন্য গর্ব ও অনুপ্রেরণার।
সংচাং ম্রোর গল্প তাই কেবল একজন নারীর চিকিৎসক হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে উঠে আসা এক কন্যার স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প। মাটিতে ও কলাপাতায় অক্ষর শেখা সেই মেয়েটিই আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে পা রেখে নিজের জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন।
অভাব তাকে থামাতে পারেনি, দুর্গম পাহাড় তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বরং বোনকে হারানোর সেই বেদনা আর বাবার স্বপ্নই একদিন সংচাং ম্রোকে পৌঁছে দিয়েছে তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
সম্পাদকীয়,বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৩৮/১, আরামবাগ,মতিঝিল-ঢাকা-১০০০
যোগাযোগ: মোবাইল ০১৭১৩-৩৩২১৫৯- ০১৩১৮-৬৮০৩৮১
আমাদেরবাংলাদেশ. ডট কম