
আহসান টিটু, বাগেরহাট জেলা সংবাদদাতা।।সিডরে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম বাগেরহাট। ২০০৭ সালের এই দিনে (১৫ নভেম্বর) ভয়ালঝড়টির আঘাতে ও জলোচ্ছ্বাসে এ জেলায় সরকারি হিসাবে প্রাণ হারায় ৯০৮ জন। এর মধ্যে শুধু শরণখোলাতেই মারা যায় আট শতাধিক। বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটি আরও বেশি। বিশেষ করে বলেশ্বর নদ ঘেরা সাউথখালী ইউনিয়নটি বিরানভূমিতে পরিণত হয়।
এছাড়া অবকাঠামো ও ফসলের ক্ষতিও ছিল বিপুল। এ অবস্থায় সিডরে সৃষ্ট ক্ষত পূরণে উপজেলাটিতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয় সরকার। সরকার এ উপজেলাকে “আউটরিচ এরিয়া” ঘোষণা করে কার্যক্রম হতে নেয়। উপজেলাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বলেশ্বর নদের তীরে ২০১৬ সালে শুরু করা হয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ। আশা করা হচ্ছে, আগামী বছরের জুনে বেড়িবাঁধটির নির্মাণকাজ শেষ হবে; যা এ অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এ বাঁধকে ঘিরে নানা দূর্ণীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আছে এলাকাবাসীর মনে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৫ সালে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প (সিইআইপি) নামে শরণখোলায় একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণের পর ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি শুরু হয় বেড়িবাঁধ ও স্লুইস গেট নির্মাণের কাজ। গত জানুয়ারিতেই এ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও বাঁধের নির্মাণ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, উপকূলবাসীকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করতে শরণখোলার ৩৫/১ পোল্ডারের ৬২ কিলোমিটার অংশে বেড়িবাঁধের নির্মাণ চলছে। এতে অর্থায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক। এরই মধ্যে আমরা বাঁধের ৭০ শতাংশ কাজ শেষ করেছি। আশা করছি, ২০২০ সালের জুন নাগাদ বাকি কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। বাঁধটি নির্মাণ হলে এ অঞ্চলের মানুষ বন্যা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

এদিকে স্থানীয়রা জানায়, নির্মাণাধীন বাঁধটির সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হচ্ছে উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের বগী, গাবতলা ও দক্ষিণ সাউথখালী এলাকা। এসব স্থানে নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধটি বারবার ভেঙে যাচ্ছে। তাদের দাবি, বলেশ্বর নদ শাসন না করে নির্মিত এ বাঁধ টেকানো সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্য ফার্স্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো অব হেনান ওয়াটার কনজারভেন্সি বলছে, নদী শাসনের জন্য তাদের বরাদ্দ নেই। ফলে নদী শাসন করাও সম্ভব হচ্ছে না।
সাউথখালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. জাকির হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় সিডরের জলোচ্ছ্বাসের কথা মনে পড়লে এখনো আঁতকে উঠি। জলোচ্ছ্বাসে সাউথখালী ইউনিয়নের অনেক মানুষ মারা যায়। এরপর থেকেই আমাদের দাবি ছিল এ এলাকায় একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক। সরকার বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ায় আমরা খুশি। কিন্তু বাঁধের নির্মাণকাজের মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। আমরা চাই, দ্রুত এর নির্মাণকাজ শেষ করা হোক। কাজের মান ভালো হোক।
বগী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলী বলেন, ঘূর্ণিঝড় সিডরে অনেককে হারিয়েছি। ভবিষ্যতে কোনো দুর্যোগে আর কাউকে হারাতে চাই না। সরকারের কাছে একটাই দাবি, যত দ্রুত সম্ভব বাঁধটি যেন সম্পূর্ণ করা হয়। সাউথখালী ইউপির চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক বলেন, শরণখোলাবাসী আজও তাদের আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এখনও ঘুর্ণিঝড় এলে মানুষের মনে ভয়াল সিডরের আতঙ্ক ভর করে। খুড়িয়াখালি গ্রামের বাসিন্দা ও পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মী তুহিন বয়াতী বলেন, শরণখোলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি একটি টেকসই বেড়িবাঁধ। তা না হলে এই এলাকার মানুষ সুরক্ষিত নয়। এটি যেন নদী শাসনের মধ্য দিয়ে টেকসই করে নির্মাণ করা হয়।