আমাদেরবাংলাদেশ ডেস্ক।।পটুয়াখালীর পায়রায় এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দেশের সবচেয়ে বড় ও সর্বাধুনিক কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। গতকাল এটি উদ্বোধনের পর ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দিতে পেরেছি। ওয়াদা করেছিলাম, প্রতিটি মানুষের ঘরকে আলোকিত করব, প্রতিটি মানুষ আলোকিত হবে, সেই আলোর পথে আমরা যাত্রা শুরু করেছি। আজকের দিনটি সেই আলোর পথে যাত্রা শুরু যে সফল হয়েছে, সেই দিন।পটুয়াখালীতে দেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী, মুজিববর্ষ, রমজান ও ঈদ উপলক্ষে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রকে জনগণের জন্য উপহার হিসেবেও ঘোষণা দেন তিনি। এদিকে সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের খবরে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী এই বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধনের পর দেশের শতভাগ জনগণকে বিদ্যুতের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন,আজকে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং মুজিববর্ষে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের ঘরে আমরা আলো জ্বালতে পারলাম, এটাই হচ্ছে সব থেকে বড় কথা। আমরা আলোকিত করেছি এ দেশের প্রতিটি মানুষের ঘরকে। সরকারপ্রধান বলেন,২০০৯ সালে সরকারে এসে আমরা বিদ্যুৎ পেয়েছি মাত্র তিন হাজার ২৬৭ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উত্পাদন ক্ষমতা ২৫ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট। এ সময়ে ১৪৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করেছি। ’
প্রধানমন্ত্রী বলেন,আমরা চাই এ দেশ এগিয়ে যাক। আজকে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলেছি, যাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ করে দিয়েছি, ডিজিটাল সেন্টার নির্মাণ করেছি। তিনি বলেন,দক্ষিণ অঞ্চল সব সময় অবহেলিত। রাস্তাঘাট,পুল,ব্রিজ ব্যাপকভাবে করে দিয়েছি। শিক্ষা-স্বাস্থ্য, বাসস্থান সব দিয়ে আমরা ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি, যা জাতির পিতা করতে চেয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন,তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা বন্দর থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু করেছি। আমরা সুপার ক্রিটিক্যাল পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছি। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছি। ’ পায়রায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সহযোগিতার জন্য এ সময় তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাহাড়, নদী, দ্বীপ, চরাঞ্চল ও হাওর-বাঁওড়ে আমরা বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দিচ্ছি। একটি জায়গাও অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকবে না। ’
প্রধানমন্ত্রী বলেন,গৃহহীন,ভূমিহীন মানুষের জন্য তিনি (বঙ্গবন্ধু) গুচ্ছগ্রাম করে; প্রতিটি ভূমিহীন মানুষ যাতে ঘর পায় সে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তারই পথ অনুসরণ করে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন মানুষকে আমরা ঘর তৈরি করে দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। যুবসমাজের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যুবসমাজকে গড়ে তুলছি উদ্যোক্তা হিসেবে। তারা যাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। টেকনোলজির ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পৌঁছে যায়, সে লক্ষ্য নিয়েও আমরা কাজ করছি। বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলে সবুজায়নের কথা বলে নেতাকর্মীদের বৃক্ষ রোপণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি জমিও খালি থাকবে না। প্রত্যেকে কোনো না কোনো কাজের মাধ্যমে উত্পাদন খাতে ভূমিকা রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান ও বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী এ এম খোরশেদুল আলম।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসংলগ্ন হেলিপ্যাডে পৌঁছলে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী পরে কয়লা জেটিতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রঙে সজ্জিত ২০০ জেলে সুসজ্জিত নৌকা থেকে পতাকা উড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে পর্যটনস্পট কুয়াকাটা থেকে পায়রা পাওয়ার প্লান্ট এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ।
উল্লেখ্য, একযুগ আগে দেশের বিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল মাত্র পাঁচ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে তা পাঁচ গুণ বেড়ে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে প্রতি ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে ৫৬০ কিলোওয়াটে। বিদ্যুতের সিস্টেম লস ১৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ সেবার আওতায় এসেছে দেশের সব জনগোষ্ঠী। জানতে চাইলে পাওয়ারসেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সারা দেশে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহক চার কোটি ২১ লাখ। তার মধ্যে দুর্গম চর ও প্রত্যন্ত পার্বত্যাঞ্চলের ৪০ লাখ গ্রাহক সোলার হোম সিস্টেমে বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে।
পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার অন্তর্গত রামনাবাদ নদীর পাশে এক হাজার একর জমিতে নির্মিত হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বের ১৩তম দেশে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কম্পানি (বিসিপিসিএল) চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি) এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি লিমিটেড (এনডাব্লিউপিজিসিএল) যৌথ উদ্যোগে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে।
আমাদেরবাংলাদেশ.কম/রাজু