মইনুল হোসেন প্লাবন।। মোঘল সাম্রাজ্যের স্থাপত্যকলার ঐতিহাসিক ও অনুপম নিদর্শন শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ঘাগড়া লস্কর ‘খান বাড়ি’ জামে মসজিদটি আজও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। মসজিদটি উপজেলার ঘাগড়া লস্কর গ্রামে অবস্থিত বিধায় কালের আবর্তে ওই মসজিদের নাম ঘাগড়া লস্কর খান মসজিদ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছে। মসজিদটি প্রায় সোয়া ২শ বছরের পুরনো হলেও আজও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। তবে জাতীয় যাদুঘরের প্রতœতত্ত¡ বিভাগ এর দেখাশোনা করলেও সঠিক পরিচর্যার অভাব ও অযতœ-অবহেলায় তা দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
মসজিদটির বাইরে থেকে বিশাল আকার দেখা গেলেও ভিতরে খুব বেশি বড় নয়। একটি মাত্র গম্বুজের উপর মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে। মসজিদের উত্তর এবং দক্ষিণ পাশে রয়েছে দু’টি জানালা। মসজিদের ভেতর ইমাম ছাড়া তিন সারি বা কাতারে ১০ জন করে মোট ৩০ জন মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে মসজিদের বাইরের অংশে অর্থাৎ বারান্দায় আরও প্রায় অর্ধশতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।মসজিদের আকার বা পরিধি যাই হোক না কেন, মসজিদে ঢুকে নামাজ আদায় করার সময় মুসল্লিদের স্মৃতিতে দুইশ বছর পেছনের মোঘল সাম্রাজ্যের অনুভূতি নাড়া দেয়।
শেরপুর জেলা সদর থেকে মসজিদটির দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। মসজিদের গায়ে যেসব নির্দশন পাওয়া গেছে সে অনুসারে ধারণা করা হয়, মোঘল সম্রাটের আমলে বক্সার বিদ্রোহীদের নেতা হিরোঙ্গি খাঁর বিদ্রোহের সময় মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। মসজিদটির দরজার ওপর খোদাইকৃত মূল্যবান কষ্টিপাথরে খোদাই করে আরবি ভাষায় এর প্রতিষ্ঠাকাল উল্লেখ করা হয়েছে হিজরী ১২২৮ বা ইংরেজি ১৮০৮ সন। তৎকালীন খান বাড়ির লোকজন এবং গ্রামের আরও অনেকেই ৫৮ শতক জায়গার উপর মসজিদটি ওয়াক্ফ করে দেয়। এর মধ্যে মসজিদটির মূল ভবন ও বারান্দা বা বর্ধিত জায়গা রয়েছে ১৭ শতকের ওপর এবং ৪১ শতকের ওপর জমিতে রয়েছে কবরস্থান।
মসজিদটির গঠনপদ্ধতি ও স্থাপত্য কৌশল শিল্পসমৃদ্ধ ও সুদৃশ্য। এক গম্বুজবিশিষ্ট ওই মসজিদের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ উভয়দিকেই সমান। মসজিদে দরজাও রয়েছে মাত্র ১টি। এর ভেতরের অংশ ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট। এর ভিতরে রয়েছে দুটো সুদৃঢ় খিলান। মসজিদের মধ্যখানে বড় গম্বুজের চারপাশে ঘিরে ছোট-বড় দশটি মিনার। এরমধ্যে চারকোনায় রয়েছে ৪টি। ভেতরে মেহরাব ও দেয়াল অঙ্কিত রয়েছে বিভিন্ন কারুকাজের ফুলদানী ও ফুল।
স্থানীয় একাধিক গ্রামবাসী জানান, মাঝে মধ্যে ঢাকা জাতীয় যাদুঘর প্রত্নতত্ত বিভাগের লোকজন এসে মসজিদের ধোয়া মোছা এবং সংস্কার কাজ করে গেলেও তা দায়সারাভাবে করে যায়। গত প্রায় ১৫ বছর আগে জাতীয় যাদুঘরের প্রত্নতত্ত বিভাগ মসজিদটির দায়দায়িত্ব গ্রহণ করলেও একজন কেয়ারটেকার নিয়োগ, একটি সতর্কবাণী লাগানো ও বছরে একবার রং করা ছাড়া আর কোনো ভূমিকা পালন করেনি। ধীরে ধীরে মসজিদটির মেঝে দেবে যাচ্ছে, দেয়ালেও ফাটল ধরছে। দ্রæত সংস্কারের ব্যবস্থা না নিলে কালের সাক্ষী এ মসজিদটি হয়তো নীরবেই হারিয়ে যাবে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন। তাই মোঘল স্থাপত্যের নিদর্শন ওই মসজিদটি রক্ষায় শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেই আশা করছেন এলাকাবাসী।