অনির্বাণ সুকুল
করোনাভাইরাস রোগ (কোভিড -১৯) একটি সংক্রামক রোগ যা সদ্য আবিষ্কৃত করোনাভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। বেশিরভাগ লোকেরা যারা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হন তারা মৃদু থেকে মাঝারি উপসর্গগুলি অনুভব করেন এবং বিশেষ চিকিৎসা ছাড়াই আরোগ্যলাভ করেন।
কীভাবে এটি ছড়িয়ে পড়ে
আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি, কাশি বা শ্বাস ছাড়লে মূলত নি:সৃত বিন্দুগুলির মাধ্যমে সংক্রামিত হয় এই ভাইরাসটি। এই নি:সৃত বিন্দুগুলি খুব ভারী তাই দ্রুত মেঝে বা বস্তু উপরিভাগে ছড়িয়ে পড়ে। কোনও ব্যক্তি যদি কোভিড-১৯ এর কাছাকাছি অবস্থানে থাকেন বা সংক্রমিত পৃষ্ঠের স্পর্শ করেন এবং তারপরে চোখ, নাক বা মুখে নিজের হাত স্পর্শ করেন, তখনই ভাইরাসটি আক্রমণ করে।
গমস্ত ভাইরাস অন্তঃকোষক পরজীবী।
তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানবকোষের প্রক্রিয়াগুলি নিজের কপি তৈরি করা। গবেষণায় প্রমাণিত যে এটি এসিই-২ নামে পরিচিত একটি ঝিল্লি প্রোটিন দ্বারা মানব দেহে প্রবেশ করে। অ্যাঞ্জিওটেনসিন কনভারটিং এনজাইম ২ বা সংক্ষেপে এসিই-২ রিসেপ্টর সহানুভূতিশীল স্নায়ুতন্ত্রের একটি অংশ। তাদের কাজ হলো এসিই-২ হরমোনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেহের স্ট্রেস প্রতিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া।
এসিই-২ হরমোন রক্তনালীগুলি সঙ্কোচনে ভূমিকা রাখে যা দেহে রক্ত চাপ বাড়ায। কোভিড -১৯ ভাইরাসটি এসিই-২ রিসেপ্টারের সঙ্গে আবদ্ধ হতে পারে, কারণ এটি প্রাণিজ থেকে উৎপত্তি। আবদ্ধ হওয়ার পর কোষটি বিনষ্ট হয়। সার্স-কোভ -২ কোষের জিনগত প্রজনন সরঞ্জামগুলির নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়, নিরলসভাবে নিজেকে প্রতিলিপি করে এবং পাশের কোষগুলিতে অনুপ্রবেশ করতে থাকে।
ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপযুক্ত লোকেরা- যারা সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক, প্রায়শ এসিই ইনহিবিটারযুক্ত একশ্রেণির ওষুধ খান। এই ওষুধগুলি রক্তনালী গুলির সংকোচনকে সীমাবদ্ধ করে এবং এসিই ২ রিসেপ্টর সারা শরীর জুড়ে বিস্তার লাভ করে। কিছু বিজ্ঞানী অনুমান করেছেন যে, এই কারণেই এই সমস্ত লোকেরা কোভিড -১৯ আক্রমনে অনেক বেশি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে গেছেন।
জনস হপকিন্স বেভিউ মেডিকেল সেন্টারের একজন পালমোনোলজিস্ট পানাগিস গ্যালিয়াটসাতস বলেছেন, “এসিই-২ রিসেপ্টর আমাদের অঙ্গগুলির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায। তারা জিহ্বা এবংআমাদের খাদ্যনালীর কোষে রয়েছে।এগুলি কিডনি, হার্ট এবং খাদ্যনালীর কোষেও পাওয়া যায়, যে কারণে পেটের লক্ষণগুলি, যেমন ক্ষুধাহ্রাস পাওয়া ও ডায়রিয়ার লক্ষণ করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের দেখা দেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল, এসিই-ি২ রিসেপ্টরগুলি ফুসফুসের সবচেয়ে সূক্ষè অংশের কোষে উপস্থিত হয়, যার নাম আল্ভিওলি। এগুলি অক্সিজেন গ্রহণ এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড মুক্ত করার মত অত্যাবশ্যক গ্যাস এক্সচেঞ্জের জন্য দায়বদ্ধ। এই কোষগুলির ক্ষতি হলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ফুসফুস, সংক্রমণটি বহিষ্কার করার চেষ্টার ফলে কাশি শুরু হয়।
প্রাথমিক গবেষণায় এও প্রমাণিত হয়েছে, লক্ষণহীন লোকেরা সংক্রামক হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ভাইরাস বা সংক্রমণ ছড়াতে পারে। কোভিড-১৯ এর মৃত্যুর হার সার্স এবংমার্স এর তুলনায় অনেক কম। কারণ এর মৃত্যুর হার শতকরা ১ থেকে ৪ শতাংশ। মানুষের মধ্যে কোভিড-১৯ অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কারণ তারা জানেনা যে তারা এই ভাইরাস বহন করছে।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর) জানিয়েছে যে, ৮০ শতাংশ কোভিড-১৯আক্রান্ত রুগীরা লক্ষণহীনভাবে ঘুরছে, আর ঠিক এই কারণেই এর ভয়াবহতা এত বেশি। যেহেতু আজ অবধি কোভিড -১৯ এর কোনো সফলতম চিকিৎসা বের হয়নি, তাই আপনার নিজের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাই এখন কোভিড -১৯ সংক্রমণ থেকে আপনাকে রক্ষা করবে।
চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যাপারে বলার আগে বলি কীভাবে আপনি প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবেন।
আপনার দেহের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বৃদ্ধির উপায়
১. পর্যাপ্ত পরিমানে ঘুম। আসলে, অপর্যাপ্ত বা দুর্বল মানের ঘুম দ্রুত অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেবে। মনে রাখবেন ঘুম ও দেহের প্রতিরক্ষা খুব নিবিড়ভাবে যুক্ত ।
২. বেশি পরিমাণে ফলমূল, শাকসবজি, বাদাম, বীজ এবং লেবুজাতীয় খাবার খাবেন যেগুলি পুষ্টিকর এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ যা ক্ষতিকারক রোগজীবাণুগুলির বিরুদ্ধে আপনাকে লড়তে সহায়তা করবে। এই খাবারের
অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলি ফ্রি র্যাডিকাল নামক যৌগগুলির সাথে লড়াই করে প্রদাহ হ্রাস করতে সহায়তা করে, যা উচ্চমাত্রায আপনার দেহে তৈরি করলে তারা প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
৩. স্বাস্থ্যকর ফ্যাট খান, যা আপনি পাবেন অলিভঅয়েল এবং স্যামন মাছের স্বাস্থ্যকর চর্বিতে; যা প্রদাহ হ্রাস করে আপনার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
অলিভ অয়েল, যা অত্যন্ত প্রদাহ-বিরোধী, যা হৃদরোগ এবং টাইপ টু ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের হ্রাসের সাথে যুক্ত। এছাড়াও, এর প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্যগুলি আপনার শরীরকে ক্ষতিকারক রোগজনিত ব্যাকটিরিয়া এবং ভাইরাসগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করতে পারে।
৪. রোজ একটি প্রোবায়োটিক পরিপূরক খাবার খান। এই খাবারগুলির মধ্যে দই অন্তর্ভুক্ত।
৫. শর্করা যোগ করা খাবার সীমাবদ্ধ করুন।
৬. পরিমিত ব্যায়ামে নিযুক্ত হন।
৭. হাইড্রেটেড থাকুন বা পর্যাপ্ত পানি খান।
৮. আপনার মানসিক চাপ স্তর আপনার নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
৯. কিছু পরিপূরক খাবেন- যেমন, ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, রসুন, হলুদ, জিরার মতো মশলা রান্নার সাথে যোগ করুন। এপর্যন্ত দেখা গেছে, কোভিড -১৯ আক্রান্ত রোগীরা প্রধানত তিন রকম লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এৃদুরোগ বেশিরভাগ রোগী মৃদু লক্ষণই অনুভব করে। এটি প্রতি ১০ জনের মধ্যে আটজনের একটি হালকা সংক্রমণ করে, যার মূল লক্ষণগুলি হচ্ছে জ্বর এবং কাশি। শরীরে ব্যথা, গলাব্যথা এবং মাথাব্যথা সবই সম্ভবত নাও থাকতে পারে।
জ্বর হলো সংক্রমণটির প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি প্রতিক্রিয়ার ফলাফল। এটি ভাইরাসটিকে শনাক্ত করে শরীরের একটি আক্রমণকারী হিসাবে চিহ্নিত করে এবং সাইটোকাইনস নামক রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলিমুক্ত করে। মারাত্মকরোগ
যদি রোগটি অগ্রসর হয় তবে এটি ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার কারণে হবে। ফুসফুসের প্রদাহকে নিউমোনিয়া বলা হয়। এই অবস্থায় ভাইরাসটি রোগীর মুখ দিয়ে বাতাসের পাইপ থেকে নিচে এবং ফুসফুসের ক্ষুদ্রনলগুলোর মধু।