কুড়িগ্রামে ডিলারশিপ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সারের সাইনবোর্ড, স্থানীয়দের মধ্যে বিভ্রান্তি
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের কালীরহাট বাজারে সারের ডিলারশিপ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই একটি দোকানে ডিলার প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড টাঙানোকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যে ঘরে সারের ডিলারের সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে, একই ঘরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পণ্যও বিতরণ করা হয়।
কালীরহাট বাজারের ওই দোকানে টাঙানো সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে— ‘মেসার্স সিনথিয়া ট্রেডার্স, প্রোঃ মোঃ শহিদুল ইসলাম, রাসায়নিক সার বিক্রেতা, কালীরহাট বাজার, বেলগাছা, কুড়িগ্রাম সদর।
স্থানীয়দের দাবি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার হিসেবে ওই ঘরে পণ্য বিতরণ করেন হালিমা খাতুন। তিনি বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান সদর থানা বিএনপির আহ্বায়ক মাহাবুবার রহমানের স্ত্রী। আর সারের ডিলার হিসেবে সাইনবোর্ড টাঙানো মোঃ শহিদুল ইসলাম মাহাবুবার রহমানের আপন ছোট ভাই—এমন তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন, একই স্থানে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পণ্য বিতরণ এবং সম্ভাব্য সার ডিলারের কার্যালয় স্থাপন করা হলে স্বার্থের সংঘাত বা প্রশাসনিক কোনো সমস্যা তৈরি হবে কি না। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা আপত্তির তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে বেলগাছা ইউনিয়ন বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী অভিযোগ করেছেন, শহিদুল ইসলাম ৫ আগস্টের আগে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না এবং সে সময় তিনি বিদেশে ছিলেন। পরে সদর থানা বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে তাকে বেলগাছা ইউনিয়ন আহবায়ক কমিটির ৮ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে বেলগাছা ইউনিয়নের নেতাকর্মিরাও অভিযোগ করেন ।
তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা এবং ত্যাগী অনেক নেতা-কর্মীকে বাদ রেখে আত্মীয়তার সূত্রে শহিদুল ইসলামকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেলগাছা ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতা বলেন, সব জায়গায় যদি নেতাদের ভাই-ব্রাদার ও আত্মীয়স্বজনই সুযোগ পান, তাহলে তৃণমূলের কর্মীরা কোথায় দাঁড়াবে ?
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মাহবুবুর রহমানের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। একাধিক বার তার মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।
ডিলারশিপ চূড়ান্ত নয়, তবু সাইনবোর্ড কেন,এমন প্রশ্নের জবাবে শহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি আবেদনকারীদের মধ্যে ‘এক নম্বর সিরিয়ালে’ আছেন এবং ইনশাআল্লাহ ডিলারশিপ পাবেন। তদন্ত কর্মকর্তারা তদন্তের সময় সাইনবোর্ড দেখবেন—এমন কথা বলায় তিনি সাইনবোর্ড টাঙিয়েছেন বলেও জানান।
দোকানটি ছোট এবং সেখানেই কেন সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে,এ প্রশ্নের জবাবে শহিদুল ইসলাম বলেন, তদন্তের সময় কর্মকর্তাদের একটি ঘর দেখানোর প্রয়োজন ছিল। পরে ডিলারশিপ হলে অন্য জায়গায়ও কার্যক্রম স্থানান্তর করা যাবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের সঙ্গে যুক্ত যুব উন্নয়ন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, যতগুলো আবেদন পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। কাউকে বাদ দেওয়া বা ডিলারশিপের জন্য চূড়ান্ত করা তাঁদের এখতিয়ার নয়; তাঁদের কাজ হলো তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া।
এদিকে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একাংশের আশঙ্কা, দলীয় পরিচয় বা পারিবারিক প্রভাবের ভিত্তিতে যদি সরকারি সার বিক্রির ডিলারশিপ বণ্টন করা হয়, তাহলে তৃণমূলের প্রকৃত আবেদনকারীরা বঞ্চিত হতে পারেন। তাঁদের দাবি, আবেদনকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং যোগ্যতা, সততা, ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে ডিলার নির্বাচন করা হোক।
স্থানীয়দের আরও আশঙ্কা, সার বিতরণে অনিয়ম হলে কৃষকদের মধ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। তাই ডিলারশিপ চূড়ান্তের আগে সাইনবোর্ড টাঙানোর বিষয়টি, দোকানের ব্যবহার এবং আবেদনকারীদের যোগ্যতা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বচ্ছভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কুড়িগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের প্রশ্ন ‘সুযোগ যদি কেবল কয়েকজনের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তৃণমূলের অন্যরা কোথায় যাবে?
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মোঃ রওশন কবির বলেন, সার ডিলারের লাইসেন্স আবেদন আমরা যাচাই – বাচাই শেষে তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, কারা লাইসেন্স পাবেন এটা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত, এখনো কাউকে লাইসেন্স প্রদান বা কাউকেই লাইসেন্স প্রাপ্তির আশ্বাস দেয়া হয়নি, কেউ যদি অগ্রিম সাইনবোর্ড টানান এটা তার সিদ্ধান্ত। তারপরও বিষয়টি যেহেতু আমার নজরে এসেছে আমরা খতিয়ে দেখব।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সব আবেদনকারীর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত শেষে যোগ্য ও নীতিমালা পূরণকারী ব্যক্তিকেই ডিলারশিপ দেওয়া হবে।