সরকারী নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সরকারী বেঁধে দেয়া মূল্যে তামাক ক্রয় না করায় বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। লাভের টাকা যাচ্ছে তামাক কোম্পানি আর তাদের দালালদের পকেটে। সরকারিভাবে তামাকের একটি নির্দিষ্ট দাম ধরা থাকলেও তা তোয়াক্কা না করে কম দামে তামাক কেনা হচ্ছে কৃষকদের কাছ থেকে। নগদ টাকার প্রয়াজনে কৃষকরাও বাধ্য হচ্ছেন কম দামে তামাক বিক্রি করতে।
লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানাগেছে, চলতি বছর জেলায় ৮ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিত তামাক চাষ হয়েছ। গত বছর এর পরিমান ছিল ৯ হাজার ১৩০ হেক্টর। তবে স্থানীয় চাষীদের মতে চলতি বছর আবাদ হয়েছে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে।
সরকারীভাবে বার্লি-১ প্রতি কেজি ৯২টাকা, বার্লি-২ প্রতি কেজি ৮৮ টাকা, বার্লি-৩ প্রতি কেজি ৮৬ টাকা এবং গ্রেড বহির্ভুত বার্লি তামাক ৪৫ টাকা কেজি দর নির্ধারণ করা হয়।
সরেজমিন জেলার আদিতমারী উপজেলার নাসির লীফ টোব্যাকা কোম্পানীর ক্রয় কেন্দ্র গিয়ে দেখা গেছে, সব্বোচ্চ ৬০ টাকা কেজি দরে তামাক কিনছে প্রতিষ্ঠানটি। তামাক কোম্পানিটি প্রতি কেজি তামাক ৬০ টাকা থেক শুরু করে ৩০ টাকা কেজি দরে ক্রয় করছে। কোম্পানিটির দায়িত্বে থাকা এরিয়া ম্যানজার আনোয়ারুল ইসলাম অকপট ওই মূল্যে তামাক ক্রয়ের কথা স্বীকার করে বলেন, কোম্পানির বেঁধে দেয়া দামই তারা লুজ পদ্ধতিতে তামাক কিনছেন।
উপজেলার আরেক কোম্পানি আবুল খায়ের টোব্যাকাতেও ৯০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ টাকা কেজি দরে তামাক ক্রয় করা হচ্ছে।
এ বিষয় আবুল খায়ের টোব্যাকোর এরিয়া ম্যানজার (সাপ্টিবাড়ি অঞ্চল) ইকতিয়ার আহমদ এর সাথে কথা বলার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
আদিতমারী উপজলার ভাদাই গ্রামের তামাক চাষি নজরুল ইসলাম (৫৩) জানান, তামাক চাষ ক্ষতিকর জেনেও লাভের আশায় কৃষকরা এই ফসল চাষাবাদ করেন। কিন্তু এ বছর তাদের লাভের আশায় গুড়েবালি। করোনাকে পুঁজি করে তামাক কোম্পানিগুলো কম দামে তামাক কিনতে প্রতারণার জাল ফেলছে। আর টাকার প্রয়োজন হওয়ায় কৃষকরাও বাধ্য হয়েই প্রতারণার জালে আটকা পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘টাকার প্রয়োজন হওয়ায় বাধ্য হয়ায় কম দামে তাংকু বেচে ফেলবার নাগছি। কোম্পানিগুলা হামাক খালি খালি মিছা কথা কয়া তাংকু আবাদ করে নিছে।’
একই উপজেলার সাপ্টিবাড়ি গ্রামের তামাক চাষি সোহাগ মিয়া জানান, গত বছর প্রতি মণ তামাক তিন হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছিলাম। কিন্ত একই তামাক এ বছর বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে। করোনার জন্য বাইর থেক পাইকার আসছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কৃষকের ঘর এবার তাংকু আবাদ করি শ্যাষ হয়া গেলো। তামাক কোম্পানিগুলা হামাক যেমন করি নাচায় হামরা, ওদান করি নাইচপার নাগছি। মহিষখোচা হাটের তামাক ফড়িয়া (দালাল) আব্দুল হক (৪৫) জানান, তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে তামাক কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, কোম্পানিগুলাও কমদামে তামাক কিনছে। তিনি বলেন, ‘তামাক কোম্পানির দেওয়া দাম অনুযায়ী আমরা চাষিদের কাছ থেকে তামাক কিনছেন বলে দাবি করেন। এদিকে জেলার সাপ্টিবাড়িতে অবস্থিত ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোম্পানিটি সরকারী বেঁধে দেয়া দামের চেয়েও অতিরিক্ত দাম দিয়ে তামাক ক্রয় করেছেন। এ বিষয়ে কোম্পানিটির সাপ্টিবাড়ী অঞ্চলের এরিয়া ম্যানেজার নুর আলম বলেন, কোম্পানির পলিসি অনুযায়ী প্রতি বছরই আমরা সরকারী মূল্যের চাইতে বেশি দামে তামাক ক্রয় করে থাকি। কোম্পানি কোনভাবেই কৃষককে ঠকাতে চায় না। কেননা কৃষক না বাঁচলে কোম্পানি হারিয় যাবে এমনটাই দাবী তার ।
লালমনিরহাট জেলা বিপণন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, ‘সরকারিভাবে নন গ্রেড প্রতি কেজি তামাকের দাম ৯২ টাকা ধার্য করে দিলও কোম্পানিগুলা তা কিনছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। দু-একটি কোম্পানি ছাড়া সবগুলো কোম্পানির একই চিত্র। নিয়ম অনুযায়ী তামাক চাষিদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাসহ মাস্ক বিতরণ করবে কোম্পানিগুলো। কিন্ত সেটিও করছে না তারা। আর ওজনও রয়েছে কারচুপি।