নিজস্ব প্রতিবেদক: হাইওয়ে পুলিশের অভ্যন্তরে আর্থিক অনিয়ম, মাসোয়ারা আদায় এবং চরম প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) মাহবুবুল হক ভূঞার বিরুদ্ধে। প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত ফাইল ধামাচাপা দেওয়া, অনুমতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও সরকারি মোটরসাইকেল ও জ্বালানি তেল বরাদ্দে দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে তার বিরুদ্ধে।
টাকা দিয়ে ওসি পদায়ন ও আর্থিক অনিয়মে প্রত্যাহার
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে হাইওয়ে পুলিশের তৎকালীন প্রধান মো. শাহাবুদ্দিনের মাধ্যমে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে প্রভাব খাটিয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের অধীন চিরিংগা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে পদায়ন নেন মাহবুবুল হক ভূঞা। সেখানে দায়িত্ব পালনের মাত্র তিন মাসের মাথায় তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়সহ ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। গুরুতর এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ তাকে দ্রুত প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ঢাকায় সংযুক্ত করে এবং শুরু হয় অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ফাইল ধামাচাপা
অভিযোগ তদন্ত চলাকালেই দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। পরবর্তীতে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি দেলোয়ার হোসেন মিঞা। অভিযোগ রয়েছে, দেলোয়ার হোসেন মিঞার সাথে পূর্বে একই সাথে চাকরি করার সুবাদে ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রভাব খাটিয়ে নিজের বিরুদ্ধে চলমান আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদন কৌশলে ‘নথিভুক্ত’ করিয়ে নিয়ে অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি পান মাহবুবুল।
প্রশাসন শাখায় অনিয়মতান্ত্রিক পদায়ন ও শৃঙ্খলাভঙ্গ
তদন্ত থেকে পার পেয়ে পদের মঞ্জুরি বা অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রশাসন শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আরওআই হিসেবে পদায়ন নিশ্চিত করেন তিনি। একজন প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তিনি চরম শৃঙ্খলাহীনতার নজির স্থাপন করেন। ২০২৫ সালে পায়ে ব্যথার অজুহাতে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো প্রকার দাপ্তরিক ছুটি, সিক লিভ কিংবা হাসপাতাল/মেডিকেল ছুটি না নিয়েই টানা তিন মাসেরও বেশি সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হবে যে, তিনি মিথ্যা অসুস্থতার অজুহাতে রাজধানীর মিরপুরের বাসায় বসেই টানা ৮০ থেকে ৯০ দিন কাটিয়েছেন।
থানা-ফাঁড়ি থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়ের সিন্ডিকেট
হাইওয়ে পুলিশের সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় পদায়িত থাকার সুবাদে মাহবুবুল হক ভূঞা বিভিন্ন হাইওয়ে থানা, ফাঁড়ি ও রিজিয়ন কার্যালয় থেকে নিয়মিত অবৈধ মাসোয়ারা গ্রহণ করে আসছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেল বরাদ্দ ও সরকারি জ্বালানি বিক্রি
দাপ্তরিক সুবিধার অপব্যবহারের আরেক নজির স্থাপন করেছে তার নামে বরাদ্দকৃত সরকারি যানবাহন। মাহবুবুল হক ভূঞা নিজে মোটরসাইকেল চালাতে পারেন না এবং তার কোনো বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। নিয়ম অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে কারও নামে সরকারি যানবাহন বরাদ্দ করার নিয়ম না থাকলেও তিনি প্রভাব খাটিয়ে মোটরযান দপ্তর থেকে মোটরসাইকেল বরাদ্দ করান। শুধু তাই নয়, ওই মোটরসাইকেলের বিপরীতে প্রতি মাসে সরকারের বরাদ্দকৃত জ্বালানি তেল উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষের অগোচরে বাইরে বিক্রি করে নিয়মিত অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করে আসছেন তিনি।
অপেশাদার ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকা বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি।